সেটা আমার ছোট বেলা। বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন, ঠাকুমার বোন; আমরা ওনাকে,’দিদা’ ডাকতাম।উনি বিধবা হলেও আমার ঠাকুমার মত সাদা শাড়ি বা নিরামিষাশী ছিলেন না। সে টা অবশ্য গল্প না।

  সেদিন্টা খুব সম্ভবত ভাই ফোঁটা ছিল। দিদা, দশ টাকার একটা নোট দিয়ে বললেন, “যাও পপিন্স কিনে খাও”। আমাদের অজ পাড়া গাঁয়ে একটাই দোকান, সবেধন নীলমণি ‘নিলমনি’ কাকুর দোকান।গৌতম স্টোর্স। দশ টাকা তো অনেকদূর বাড়িতে আমাদের মত বাচ্চাদের হাতে দশ পয়সাও কেউ দিতোনা, আর বাবাতো আমাদের বড় হওয়ার পরেও হাতখরচের অস্তিত্ব স্বীকার করতেন না। তো সেই দশ টাকা এবং পপিন্স নামের এলিয়েন বস্তু আমাকে কিছুক্ষন নির্বাক করে রাখলো। দিদা কে জিজ্ঞাসা করলাম, “পপিন্স কি?” উনি বললেন এক ধরনের লজেন্স। আমি তখন অবধি ‘মাছ’ লজেন্স এবং ট্রেনে ‘লেবু লজেন্স, ঝাল লজেন্স’ই দেখেছি। অনেক আশা নিয়ে দৌড়োলাম নীলমণি কাকুর দোকানে।এখানে একটা কথা বলা দরকার যে, এই নীলমনি লোকটি খুব ই ছ্যাঁচড়া টাইপ ছিলেন।আমরা যেহেতু ধারে নিতাম তাই আমাদের মত বাচ্চাদের প্রায় কুকুর, বেড়ালের মত ব্যাবহার করতেন। যদিও খুব প্রোয়োজন ছারা বাবা কিছুই কিনতেন না। তো আমি গিয়ে ওনাকে ‘পপিন্স’ দিতে বললাম। উনি তখন পাড়ার অবিবাহিত পিসীদের সাথে রসালো আড্ডা দিচ্ছিলেন। তো মুখ খিঁচিয়ে বললেন, ‘পপিন্স’ নেই আমার দোকানে যা ভাগ! যদিও পপিন্সের সাথে আমার চাক্ষুষ পরিচয় নেই, তবু হাতে টাকা নিয়ে গিয়েও এতো বিরক্তি শুনে চলে আসবো? তাই পিয়ার্স গ্লিসারিন সাবানের প্যাকেট এবং ওর গায়ে ট্রান্সপারেন্ট সাবানের ছবিটাকেই সম্ভাব্য লজেন্স ভেবে বললাম, “ওই যে ঐ প্যাকেট তা”……নীলমনি দোকানদার শেয়ালের মত হেসে বললো বাপের জন্মে চোখে দেখেছিস কিছু? ওটা সাবান, তোর জন্য এখানে পপিন্স নিয়ে বসে নেই। আমার মত একটা নিষ্পাপ শিশুকে অপমান করে উনি এবং ওনার সঙ্গী দের কি আনন্দ হল বুঝলাম না তবে ওদের সেই উপেক্ষার হাসি আমি আজ ও ভুলতে পারিনি।

  তার অনেকবছর পরের কথা। বাবা তখন আমাদের বাড়িটা দোতলা করছেন, সেই নীলমনি তখন মুদি দোকান ছেড়ে ইট, সিমেন্ট  এর ব্যাবসা করে। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বাবার সাথে নীলমনি কথা বলছে। মানে পটাচ্ছে যাতে বাবা ওর কাছ থেকেই মাল পত্র কেনে। শালার হাত কচলানো আর তেলালো হাসি দেখে মনে হচ্ছিল বলি, ‘বাপের জন্মে কত কিছুই দেখলাম’, বলা হয়নি। ছিঃ! আমি ভালোমায়ে না?!       

Advertisements