01

রামানন্দ কে কাকা নিয়ে এসেছিলো আমাদের বাড়িতে। সহায়-সম্বলহীন এক মানুষ।আমাদের বাড়ির পিছনে বেশ খানিকটা ঘাস আর বড় বড় কাঁঠাল, পেয়ারা, আম গাছ ছিলো আর আগাছায় ভর্তি। কাকা বলেছিলো, জমিটা পরিস্কার করবে, ফুলের গাছ লাগাবে, ঘরের সাথে লাগোয়া মাটির একটা ঘর ছিলো, কয়লা, ঘুঁটে রাখার, ওখানেই শোবে; পেতে ভাতে থাকবে।

  প্রথম প্রথম কেমন যেন লাগতো। কালো, রোগা খাটো চেহারায় মোটা ঠোট।সকালে এক গ্লাস চা আর গোটা দশেক রুটি খেতে খেতে মা কে বলতো, ‘দিদি, চা খায়া লাইগা জামু, এইখান থিকে হুই খান এক্কেরে সাফা কইরা তবে।‘ ও বাবা! কোথায় কি? ও নিড়ানি, দা, কুড়াল, ঝুড়ি নিয়ে মহা সমারোহে জমিতে নামলো, ভাই ও কৌতুহলে ওর সাথে যেতেই, ‘হেই পুলা, জাও।‘

ভাইও ঠ্যাটা, ‘কেন যাব?’

‘থ ফালায়া’ বলে সব ফেলে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেলো।

মা তো ভাইকে খানিক বকলো, ‘কি দরকার ছিল, ওর সাথে জমিতে যাওয়ার?

ঠিক একটা নাগাদ এসে হাজির।, ‘কই দিদি, একটু ত্যাল দ্যান। ত্যালতুল মাইখ্যা, চানচুন কইরা, ভাতডি না খায়া এই দিক থ্যাকে হুই দিক এক্ক্যারে সাফ কইরা উঠুম।‘

প্রথমে মা পরিমান মত ভাত, তার সাথে ডাল, মাছ, ঠাকুমার ঘরের নিরামিষ তরকাড়ি, চাটনী সব দিয়ে আসন পেতে খেতে দিয়েছে।রামানন্দ শুধু ডাল দিয়েই সব ভাত খেয়ে আবার মাকে ডাকলো, ‘দিদি, রান্না জবর, আর চারডা ভাত’, মা আবার ভাত দিলো, শেষ, এই করে প্রায় গোটা হাঁড়ির ভাত খেয়ে ফেললো। মা, কাকিমার তখনো, খাওয়া হয়নি, কাজের দিদির ভাত ও নেই। মা-ঠাকুমার মুখ শুকিয়ে গেছে।জদি আরো ভাত চায়? তা সেদিন ও মোটা ঠোঁট চাটতে চাটতে উঠলো। এর পর থেকে ঠাকুমা বলে দিলো, “বৌমা, তুমি রামানন্দের জন্য, ছোট হাঁড়ি তে আলাদা ভাত নিও, এর পর থেইকা”। ভাত খেয়ে সোজা কয়লা ঘরে গিয়ে ঘুম। বিকেল বেলায় ঘুম থেকে উঠে গলা খাঁকড়ি দিত্ব লাগলো। এক গ্লাস চা আবার খেয়ে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে ও আবার বেড়োলো।সাতদিন পরে কাকা এসে দ্যাখে আগাছা, জঙল যেমন কে তেমন পরে আছে।

0

কাকা ও চিল্লিয়ে ডাকলো, “এই রামানন্দ! আয় এদিকে!” আমি এমনি ই কাকাকে প্রচন্ড ভয় পেতাম, তারপরে ওই রাগী গলা শুনে ভাবলাম, আজ বোধহয় রামানন্দের শেষ দিন। রামানন্দ নির্লিপ্ত ভাবে কাকার সামনে হাজির।

“কি রে তুই কাজ না করে খালি ভাতের শ্রাদ্ধ করছিস? ব্যাটা কুঁড়ে ?”

“কাজ কাম করতেই তো চাই, কিন্তু বাপি বড় ত্যাক্ত করে(বাপি আমার ভাইয়ের নাম)।“

কাকা শুনবে কেন। বলে দিলো, তোর খ্যাঁটের বন্দোবস্ত বন্ধ করে দেবো, ব্যাটা অকম্মার ধাড়ি।“

রামানন্দ আমাদের বাড়ি প্রায় চার বছর ছিলো। উদ্ভট সব গল্প বলতো মা- কাকিমা, ঠাকুমার সামনে। তাছাড়া কিছু করতে দেখিনি। অকর্মার ধাড়ি, পেটুক রামানন্দ একদিন কোথায় চলে গেল।

জীবনে কত মানুষের সাথেই তো আমাদের দ্যাখা হয়। কিন্তু আকর্ষন করে ক’জন? সেই হিসেবে, রামানন্দ ওর ঢপের গল্প, কে জানে হয়তো কিছু সত্যিও ছিলো?

Advertisements