একা থাকার অভ্যাস কত বছরের? আমি তো জ্ঞ্যান হওয়ার পর থেকেই একাকীত্বে ভুগি। সেই কোন ছোট বেলায় বাবা-মা আমায় নৈহাটি থেকে নিয়ে হদ্দ গ্রামে বাড়ি বানিয়েছিলো। তখন তাঁরা কল্পনাও করেন নি, এত্ত ছোট মেয়ে কোনদিন অস্বীকার করতে পারে কোন জায়গা কে। আমি নিজেকে ওখানকার মানুষ ভাবিনি তখন ও, আজ ও। গ্রাম এবং গ্রামীন মানসিকতা এক নয়। যারা শিক্ষিত হয়েও আলোকপ্রাপ্ত হন না আমার চোখে তাঁরাই গ্রামীন মানসিকতার, অর্থাৎ গেঁয়ো।

2

     সন্তান জন্মদিলেই কি বাবা- মা হওয়া যায়? আমি বিশ্বাস করিনা। কত মা- বাবা নিজের সন্তান কে বলি চড়ান।আমার মা- বাবা স্বেচ্ছায় বা না জেনেই তেমন আমায় বলি চড়িয়েছেন। প্রথমত নৈহাটি ছাড়া করা। দ্বিতীয়ত মায়ের ইচ্ছের বলি বারবার আমি ই হয়েছি। সবার কাছে নিজেকে বড় দেখাতে গিয়ে আমার মন এবং শরীরের অপর অত্যাচার চলেছে বহু বছর। পড়া এবং পরীক্ষা আমার মায়ের কাছে ছিলো নিজের সম্মানের ব্যাপার। এতো মানসিক চাপ নিতে পারতাম না বলেই বোধহয় সারাবছর বিশেষ করে পরীক্ষার সময় আমার ভয়ঙ্কর অসুখ হত।

তখন আমি ক্লাস থ্রি তে পড়ি। সাত বছরের মেয়ে। খুব জটীল টাইফয়েড হয়েছিলো, স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার আগে। অনেকেই মা কে বারন করেছিলো ওই অবস্থায় আমায় পরীক্ষা না দেওয়াতে। কিন্তু মা সেতা শুনবে কেন? কোলে করে নিয়ে গিয়েও পরীক্ষা দেওয়ানো হয়েছিলো। যে কোন পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথেই রাস্তায় মা দাঁড়িয়ে থাকতো। আগে সব প্রশ্নের উত্তর বলতে হত তার পর ইউনিফর্ম চেঞ্জ করা এবং খাওয়া। ঠাকুমা মানা করতো,”মাইয়া টারে বইতে দাও, হাত মুখ ধুইয়া কিছু খাক, তারপরে জিগাইও।“ কে শোনে কার কথা। অথচ সেই একই সাথে ভাইয়ের পরীক্ষা, ও ফেল ও করতো, তাতে মায়ের কিচ্ছু এসে যেতো না।আমি ভেবে দেখেছি, এই সব আমার সাথে মা এই জন্য করতো যাতে সবাই বোঝে মা কালো মেয়ের জন্ম দিলে কি হবে সেই কালো মেয়েটি গুনি। এই সব অস্বাভাবিক আচরন মা নিজের গর্ভের লজ্জা লুকাতে করতো। অত সুন্দরী আমার মা, তার যদি আমার মত কালো, রুগ্ন মেয়ে হয় সেটা হয়ত লজ্জার।

0

  আজ ও মা চায়না আমি সম্পত্তির ভাগ নেই। আমার বাবা আমার বিয়েতে অনেক খরচ করেছিল কিন্তু আমার জন্য দুটো শারি ছাড়া কিছুই দেয়নি। সাধারন হাতে, কানে, গলায় সোনার গয়না, ব্যাস। আমার নতুন জীবন শুরু করতে যে কিছু টাকা দেওয়া উচিত, যে খানে একদম চোখ বন্ধ করে বিহার থেকে যাওয়া একটা ফ্যামিলি, তায় আবার ছেলে চাকরী করে গুজরাটে। একে চোখ বন্ধ না বলে আর কি বলি? যদি, গুজরাটে গিয়ে দেখতাম বরের অন্য বঊ আছে? তবে? আমাকে শ্বশুর বাড়িতে যত অপমান সইতে হয়েছে, তা কোন শিক্ষিত মেয়ে সহ্য করবে না। কিন্তু আমি সব সহ্য করেছি কেননা জানতাম আমার ফেরার পথ নেই।প্রেমের বিয়ে না হলেও এই কথাটা জানা ছিলো। আমার ভবিষ্যত কেমন হবে তার দায় মা নেবে না। মা শুধু আরেকবার আমায় সম্পত্তির থেকে বঞ্চিত করে শহীদের মা হতে চায়। কালো মেয়ে আমি হয়তো আবার শহীদ হব।

Advertisements