একটা সময় এমন ছিলো যখন চব্বিশ ঘন্টা ও রমিতার কাছে কম মনে হত। ।এখন সময় আর কাটেনা

ভোর পাঁচ টায় উঠে স্নান, পুজো সেরে ছেলে, বরের টিফিন বানিয়ে ওদের স্কুল এবং অফিস রওনা করিয়েই শুরু হত দুপুরের রান্না। শ্বশুর- শাশুড়ি তখন জীবীত, তাদের সময়ে ওষুধ, খাবার সব নিজে হাতে করতে করতে কখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতো। সারাজীবন ছেলে কে নিজে পড়িয়েছে।সময় কত দ্রুত কাটে। সেই ছেলে এখন জাপানে। ছেলের জন্য গর্বে বুক ভরে যায়। শ্বশুর, শাশুড়ি গত হয়েছেন বহু দিন হল। রাজীবের রিটায়ারমেন্টের এখনো দু বছর বাকি।সব ই হয়েছে, গাড়ি তো আগেই কিনেছিলো,  বাড়ি হয়েছে; যা হয়নি তা হল রমিতার নিজের একটা জগত বানানো।অন্য মহিলাদের মত আড্ডা দিয়ে দিন কাটাতে তো কোন দিন ই পছন্দ করতো না।

mm

সেভাবে দেখলে পঞ্চান্ন বছর এমন কিছু বয়স না। কিন্তু ভারত বর্ষে এই বয়সে চাকরী কোথায়? আর চাকরী করার মেন্টালিটি ছিলোনা কখনো। যত বড়ই চাকরী হোক তা দাসত্ব ই মনে হয়েছে।ছাত্রী হিসেবে খুব খারাপ ছিলো না, ভেবেছিলো বিয়ে করবে না চাকরী করে স্বাধীন ভাবে থাকবে। সে আর হল কোথায়?

এতো বেশি সংসারে সময় দিয়ে নিজের পরা আর লেখার হাত তাই যা বাঁচাতে পেরেছিলো।

হঠাত ভাবলো লেখা দিয়ে কিছু কি করতে পারবে?

আজ রমিতা সকাল থেকেই ল্যাপটপে খুঁজছে পুরোনো লেখা গুলো। দু একটা পড়ে নিজেই নিজেকে শুন্য দিলো। ইসস, ম্যাগো! এই সব লেখা চলবে না। তাহলে? এখন তো বাংলায় কেউ পড়েই না। ইংলিশে আজ ও নিজেকে প্রকাশ করতে পারেনা।লকারের একদম পেছন দিকে কিসের একটা নরম ব্যাগ হাতে ঠেকছে! টেনে এনে অবাক হয়ে গেলো! এই তো সেই ব্যাগ, বিয়ের তিনমাস পরে একমাসের জন্য মা- বাবার কাছে গেছিলো ও। হঠাত দশ দিনে বিয়ে ঠিক হয়ে বাংলা থেকে গুজরাটে চলে এসে খুব মন খারাপ লাগতো।রাজীব তখন খুব কম মাইনে পেতো।সকালে উঠে চা খেয়ে অফিসে চলে যেত আর ফিরতো রাতে।রমিতার ইচ্ছেই করতো না নিজের জন্য রান্না করার।রাধতে ও তো জানতো না।সন্ধ্যেবেলায় রান্না করতো।রাজীব কেও ঠিক বুঝতে পারতো না।সে যে কি সময় গেছে! তাই বাবা- মা ওকে দেখতে আসায় ও বায়না ধরেছিলো যাওয়ার। এক মাসেই বুঝে গেছিলো কি শ্বশুর বাড়ি। ছোট ননদের কথায় চলতো শশুড়ি। লাঠির মার ভোলা যায় কথার মার আমৃত্যু মনে থাকে।রমিতা তখন রাজীব কে চিঠি লিখেছিলো রাজীব কে নিয়ে যাওয়ার জন্য; কারন বলেনি। কিন্তু রাজীব আসেনি নিতে। ফোনে বলেছিলো সাধ মিটিয়ে বাপের বাড়ি থেকে এসো। ও বলতে পারেনি যে বাপের বাড়ি যেতেই দিচ্ছেনা।এক মাসে রমিতা যত চিঠি আর গ্রিটিংস কার্ড পাঠিয়েছিলো; সব রাখা আছে এই ব্যাগে।আজ পড়তে গিয়ে যেন টাইম ট্রাভেল হয়ে গেলো।এতো অত্যাচার করা শাশুড়িকে আজ ও মাফ করতে পারেনা তবু শেষ দিন অবধি কর্তব্যে ত্রুটি করেনি।

Parents Carrying Child

মানুষ কেন যে অন্যের ওপর শারিরীক, মানসিক অত্যাচার করে আজ ও বোঝেনা। তখন রমতা দুর্বল ছিলো, তাই শাশুড়ি, শ্বশুর, ননদ সব্বাই যা পেরেছে বলেছে। কিন্তু ওনারা যখন শেষ বয়সে ওর কাছে এলো, কই ও তো পারলো না দুর্ব্যাবহার ফিরিয়ে দিতে?

এই সব ভাবতে ভাবতেই মোবাইল এর চেনা রিং টোন, ছেলের ফোন! মা, “তোমাদের জন্য টিকিট পঠাচ্ছি আর হ্যাঁ বাবাকে বলে দিও এবার যেন রিজাইন দিয়েই আসে।“

: এটা তুই কি বলছিস বুবলা?

: ঠিক ই তো বলছি মা, বাবার আর চাকরী করার দরকার নেই।এবার থেকে তোমরা আমার সাথেই থাকবে।

: তুই তো জানিস, আর তাছাড়া তোর ও তো বিয়ে করতে হবে সোনা। আমরা যদি মানাতে না পারি? কি দরকার?

: মা, মানার কোন ব্যাপার ই নেই।তুমি অনেক কষ্ট পেয়েছো। আমি কি তোমার মা- বাবার মতন? যে তোমায় মানিয়ে নিতে বা বৌ কে একা মানিয়ে নিতে বলবো?

: তোমরা আগে এসো তো।তারপরে ভাবা জাবে।রাখছি বেবি, উম্মা!

mmm

ছেলের সেই ছোট বেলার খেলা রমিতা কে নিজের মেয়ে বানিয়ে নকল বাবা হওয়ার খেলা, ছেলে আজ ও ভোলেনি! রমিতা চিঠিগুলো ওয়েষ্ট পেপার বক্সে ফেলে ব্যালকনি দিয়ে একবার আকাশ টা কে দেখলো। একটা দুটো তারা ফুটেছে। একটা স্বস্তির হাসি নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো, “যত আঘাত তুমি দিয়েছো ভগবান, মলম তার থেকে বেশি ই দিয়েছো।“

Advertisements