আমার সব বান্ধবীদের বাড়িতেই বাথরুম ছিলো, আমাদের দেড় কামরার বাড়িতে ছিলো চাপা কল আর তার পাশে কলা পাতা, ছিটে বেরা দিয়ে একপাশ ঢাকা, কলের উলটো দিকে শ্যাওড়ার ঝোপ, বুক সমান আগাছা মিলে প্রাকৃতিক আব্রু রক্ষার জায়গা। তাকে বাথরুম তো দূর পেচ্ছাপ খানাও বলা যায় না।আমি, মা ভোর রাতে, দুপুরে পাড়ার সবাই ঘুমালে এবং রাতে আমাদের কাজ মেটাতাম; স্বপ্ন দেখতাম বিরাট বড় একটা বাথরুমের। যেখানে বাথটয়াব থাকবে, সুগন্ধী মোমবাতি আর মায়াবী আলোয় ভরা একান্ত নিজস্ব এক স্নান ঘর! এই স্বপ্ন জিনিষ টা কেউ কোনদিন আমায় দেখতে শেখায়নি, কিন্তু মনের ভুলে আমার এই রকম অজস্র স্বপ্নের কিছু বলে ফেললেই বাড়ির লোকের হাসি আর বন্ধুদের বলা, ‘পাগল’ শুনতে হত।আমার এমন কিছু সহপাঠী ছিলো যারা আমায় ছিটেল, পাগল বলে মজা পেতো।

4

কিছু মানুষ স্বপ্ন দেখে ঘুমিয়ে আর আমি জেগে স্বপ্ন দেখতাম আর তা বাস্তব করতে পরিশ্রম করতাম। গ্রাম দেশের এক সরকারী বাংলা মিডিয়ামের মেয়ে আমি বুঝেছিলাম আমার স্বপ্ন আমাকে সত্যি করতে হলে কিছু স্ট্র্যাটেজি নিতে হবে। প্রথম হচ্ছে ভাষা শেখা, হিন্দি, ইংলিশ মোটামুটি বলতে পারতাম। কিন্তু এই মোটামুটি ব্যাপারটা আমি ঠিক নিতে পারিনা, হয় ভালো নাহলে জানিনা, মধ্যম হয়ে কি হবে? বাড়িতেই ডাইরি হিন্দিতে লিখতাম, আর গোল পার্কে যেতাম ইংলিশ বলা শিখতে। তারপরে ব্রিটিশ কাউন্সিলের লাইব্রেরি মেম্বার হয়ে ইংলিশ বই পড়তাম আর শুনতাম। আমি কি করছি, কি প্ল্যান তা আর বলতাম না।

3

পাড়ার একটা ছেলে কে ক্লাস ফোর থেকে পছন্দ করতাম। ও আমার থেকে অনেক বড় ছিলো বয়সে, লেখা পড়া হয়নি কিন্তু ভালো স্প্রিন্টার ছিলো। আমি বড় হচ্ছিলাম আর ওর প্রতি দূর্বল হচ্ছিলাম। সব সময় মনে হত ওকে একবার না দেখলে দিন বেকার; অথচ ওর বাড়ি আমার বারির থেকে এমন এক জায়গায় যে রোজ দেখতে হলে বাহানা বানাতে হত।এই ছেলেটা আমার ব্যাপারে বিন্দু মাত্র ইন্টারেস্টেড ছিলো না। এক আমি দেখতে খারা না হলেও এতো রোগা যে শরীরের যেই বাঁক দেখলে ছেলেরা আকর্ষিত হয় তা ছিলোনা। কালো জিরো সাইজ আমাকে ওর মত হ্যান্ডু দেখবে কেন? তবু তবু আমি ওকে জানালাম। এর জন্য আমার গোঁয়ার মানসিকতাই দায়ী। আসলে হবেনা, হয়না এই সব বিনা চেষ্টায় মেনে নিতে পারতাম না। আর কে বলেছে প্রেমের প্রস্তাব পুরুষ দেবে? আমার ভালো লাগা, ভালোবাসা জেনে ও হেসেই বাঁচেনা। সেইবার দুর্গা পুজোয় আমার বন্ধু ওকে বললো যে তুই ওকে ভালোবাসিস না সেটা নিজে জানা।ও ওর নাম বলতেই ভুলে গেছি, ওর নাম সোনু। একটু অবাঙালি লাগছে না? কিন্তু ওর ওই একতাই নাম ছিল। তো সেই দুর্গা পুজোর ঝলমলে রাতে ও বলল, ‘তোর সাথে ঘুরতে, সিনেমায় জেতে পারি, কিন্তু বিয়ে করবোনা। আমি খুব সুন্দরী মেয়ে ছাড়া বিয়ের কথা ভাবিনা।‘ বাজের আওয়াজে কানে তালা পরেছে আপনার কোনদিন? নইলে বুঝবেন কি করে আমার অবস্থা? আমি সেই রাতে কিভাবে বাড়ি ফিরেছিলাম জানিনা কিন্তু সেইবার পুজোর বাকি দিন গুলো আমি ঘরেই কাটিয়েছি। কান্না কাটি আমার ধাতে নেই। তার মানে তো এতাও না যে আমার কষ্ট হয়না? দশমীর রাতে পাশের বাড়ির বৌদির সাথে বসে খুব ভালো করে স্কচ খেলাম।চিকেন, ইলিশ ভাজা সোডা, আইস সব দিয়ে।জীবনে প্রথম মদ সেই দশমী। আর প্রতিজ্ঞা করলাম শালা সোনু তুই নিজে আমার কাছে ফিরবি।

2

এর পরে এক বছর তানা পড়া শোনা এবং টিকিট কলেক্টার, প্রথম পোষ্টিং নৈহাটি। আহা! আমার নিজের শহর।কালো কোট, পরে কখনো স্টেশন কখনো ট্রেনে মোবাইল চেকিং। এর মধ্যে সোনু বিয়ে করেছে, বাবাও হয়েছে, আমি যখন টাকা রোজগার এবং শেয়ারে খাটাচ্ছি তখন ওর বাবার ক্যান্সারে ওর কাছে বারি ছাড়া কিছু নেই। গলা অবধি দেনা। একদিন মোবাইল চেকিং চলছে, একজন আমাদের ঊঠতে দেখেই বোধ হয় পায়ে পায়ে দরজার কাছে। ততদিনে নাক হয়ে গেছে শকুনের আর ডব্লিউ টি বডি ল্যাঙ্গোয়েজ ও চিনে গেছি। পিছন থেকে পিঠে হাত, ‘দাদা আপনার টিকিট? আর লেডিস কম্পারমেন্ট এ উঠেছেন কেন?’ বলতেই যিনি ঘুরলেন তিনি আর কেউ নয় সেই আদি অকৃত্তিম সোনু। আপনি না তুমি কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। আমি আমার কোলিগ সিনিয়র দাদা কে কানে কানে আমার চেনা বলে ওকে নামিয়ে অন্য কামরায় ঊঠিয়ে দিলাম, নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে চালান কেটে রিসিট ওর হাতে ধরিয়ে নিজের কাজে মন দিলাম।

  এর বেশ কয়েক বছর পরে আমি বাড়ি আর স্বপ্নের বাথরুমের মালিক হয়ে যখন কুল লাইফ লিড করছি, তখন একদিন আমার মোবাইলে অচেনা নাম্বারের কল দেখে প্রথমে কেটে দিতে দ্বিতীয় কল আসায় বিরক্ত হয়ে ,’হ্যালো’ বলতেই শুনলাম, ‘এটা কি মনিকা ম্যাডামের নাম্বার?’

বলছি, আপনি কে?

আমি সোনু বলছি। আমার বুক টা ছলাত করে উঠলো।

কি ব্যাপার, কি চাই?

তুই মানে আপনার সাথে কি দ্যাখা করা যাবে?

কেন?

না আমার কিছু বলার আছে।

আমার কিছু শোনার নেই বলে ফোন কেটে দিলাম।

এই হয়। সময়ে যা পাইনি শুধু রূপের অভাবে অসময়ে টাকা, স্ট্যাটাস দেখে লোভীর মত সেই প্রেম দিতে আসলেই কি নেওয়া যায় , না নিতে হয়? ওকে ফিরিয়ে দিয়ে আমি অন্য একটি মেয়ের ঘর ভাঙার দায় থেকে নিজেকে বাঁচিয়েছি, অবশ্য ওই রকম পুরুশের সাথে ঘর বেঁধে কত দিন সে টিকবে সেতা সময়ের ওপর ছেরে দেওয়াই ভালো।‘আমি এখন ভালো আছি’ গানটা ব্যাপক লাগে কিবতু আমার, অনেক গল্প শোনালাম, এবার আসুন, আমি এখন গান শুনবো।

Advertisements