সেক্সের ব্যাপারটা না কি রকম যেন আমি ঠিক পছন্দই করতে পারিনি। আসলে এমন তো হওয়ার কথা ছিলোনা। তখন আমি কত, এই এগারো বারোর কিশোরী। এক আত্মীয় খুব দূর সম্পর্কের মামা, সে প্রায় চল্লিশ বছরের মানুষ মাঝে মাঝেই আদরের নামে শরীরের গলি ঘুঁজি হাতাতো। আমি নিজেকে নিয়ে লজ্জায় কুঁকড়ে জেতাম।খুব ঘেন্না হত জানো? আর এই ঘেন্নাই আমার অবচেতনে সেক্স কে বাতীল করে দিল।আমি তখন বুঝিনি, স্কুল ছিলো মেয়েদের, সব স্কুলে সব ক্লাসেই কিছু বয়স্ক মেয়ে থাকে অন্যদের পৃথিবীর পাঠশালা চেনাবার জন্য, আমাদের স্কুলেও ছিল। কিন্তু ওদের কথা আমায় আকর্ষন করতো না। পরে কলেজের দিন গুলোতে বুঝলাম আমি প্রচন্ড ভালোবাসতে পারি কিন্তু তাতে শরীরের কোন ভূমিকা নেই।

আমি প্রথম প্রেমে , আচ্ছা, প্রেমের প্রথম, দ্বিতীয় হয় না কি? যাই হোক আমি প্রেমে পরেছিলাম দিব্যেন্দুর।ও বেশ রোম্যান্টিক কথা বার্তা বলা, চটপটে ছেলে ছিলো। ও ইকনমিক্স আর আমি বাংলা সাহিত্য, ওর প্যারীমোহন আমার বঙ্কিম। তবু আমরা দ্যাখা করতে বা ফোনে কথা বলতে চাইতাম না।আমরা চিঠি লিখতাম। হয়েছিলো কি খবরের কাগজে আমার লেখা একটা চিঠি পড়ে ও আমায় ওর ভালো লাগা জানিয়েছিলো। তারপরে ওই চিঠি ই মাধ্যম হয়ে উঠলো।আমরা দু জনেই খুব স্বপ্ন দেখতাম।ওর ইচ্ছা ছিলো প্রফেসর হবে; আর আমিও নিজে প্রতিষ্ঠিত না হয়ে বিয়ের কথা ভাবতেই পারতাম না।অনার্স পরীক্ষায় দিব্যেন্দু খুব ভালো রেজাল্ট করলো।সেই প্রথম ফোনে কথা। কি ভালো যে লাগছিলো!পরে চিঠিতে বললো, ‘তোমার গলাটা খুব মিষ্টি! আমি রোজ সকালে এই আওয়াজে ভবিষ্যতে ঘুম থেকে উঠবো, ভাবতেও ভালো লাগছে।‘

1

দিন গুলো যেন পাখনা মেলে উড়ে জাচ্ছিলো।আমার ও গ্র্যাজুএশন কমপ্লিট, পোষ্ট গ্র্যাজুএশনের ক্লাস শুরুর আগে ও দ্যাখা করতে চাইলো।দেখা হল, গল্প ও হল, কিন্তু ও যেই হাত ধরতে চাইলো আমি শক্ত হয়ে গেলাম। খুব অবাক হয়ে জানতে চাইলো, ‘কি হল, ভয় লাগছে?’

আমি উত্তর দিতে পারলাম না; জানলে তো বলবো কি হয়েছে।

প্রথম দ্যাখা হওয়ার লিজ্জা ভাবলো কিন্তু আমি কেমন যেন বুঝতে পারলাম, আমি ঠিক স্বাভাবিক না।

তারপরে যতবার দ্যাখা হয়েছে, কখনো সিনেমায় বা রেস্ট্যুরেন্টের নির্জনতায় আমি দিব্যেন্দুর সাথে কিছুতেই ঘনিষ্ঠ হতে পারিনি।

একদিন ও একটু বিরক্তির সাথেই বললো, ‘ভালো কোন সাইকিয়াট্রিষ্ট এর কাছে গিয়ে কাউন্সেলিং করাও।‘

আমি আমার দিদির সাথে সাইকিয়াট্রিষ্টের  কাছে গেলাম। দিদি মানে জেঠুর মেয়ে, কিন্তু আমরা বেষ্ট ফ্রেন্ড ছিলাম।

ডাক্তারবাবু সব শুনলেন, আশা দিলেন কয়েকটা সিটিং এই আমি ঠিক হবো। অনেকের ই এই রকম প্রবলেম হয়।আমার কাউন্সেলিং চলতে লাগলো।এর মধ্যেই কিছু বিয়ের সম্বন্ধ এলো। আমি না করলাম; কে শোনে আমার কথা। তখন বলতে হল যে আমি একজন কে ভালোবাসি।

মা,’তুই অন্য জাতে বিয়ে করলে মনে করব, আমার মেয়ে মরে গেছে।‘

বাবা-‘আমি লোকের কাছে মুখ দেখাতে পারবোনা। তোকে স্বাধীনতা দিয়ে এই হল?’

আমি অনেক বোঝালাম, কিন্তু পুরো বাড়ি একদিকে আর আমি একা আরেক দিকে। দিদি- জামাইবাবু বোঝানোর চেষ্টা করে ব্রুটাস হয়ে গেলো।অগত্যা দিব্যেন্দু কে বলতে হল।

আমি বললাম, ‘চলো, রেজিষ্ট্রি করে ফেলি’

আমায় অবাক করে ও জিজ্ঞাসা করলো, তোমার মানসিক অসুখটা কমেছে?

হতবাক হয়ে গেলাম।

আমার এতো বছরের প্রেমিক এই কি সেই মানুষ?

আমায় আরো অবাক করে ও বললো, ‘ দেখো,এখন ও আমার এষ্টাব্লিস্ট হতে বেশ কয়েক বছর লাগবে। তুমি বরং তোমার বাবা-মায়ের পছন্দের পাত্রকেই বিয়ে করো।

আর পারলে আমায় ভুলে যেও।‘

আমার গলার কাছে একটা কিসের দলা আটকে গেছে! চোখেও ঝাপসা দেখছি।ও চলে যাচ্ছে , একবার ও আমায় পিছন ফিরে না দেখে চলে গেলো।আমি বাড়িতে ফিরিনি, রাস্তায় ই জ্ঞান হারাই, চোখ খুলতে দেখি হাসপাতালে।

বেশ কিছুদিন আমায় হাসপাতালেই থাকতে হল। দিদি কতবার জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছিলো, আমি কিছুই বলতে পারিনি।

পোষ্ট গ্র্যাজুএশনের রেজাল্ট খুব ভালো না হলেও খারাপ ও হলনা। আমি ডক্টরেট না করে সিম্পল বি।এড করলাম। ততদিনে খবর পেয়েছি দিব্যেন্দু পুনে চলে গেছে। চাকরী নিয়ে না পড়তে জানা হয়নি।

3

আমার মা-বাবা একদম জোর করে বিয়ে দিয়ে দিলো।আমি আর পারছিলাম না। কি বলে মানা করতাম? আমি যৌন শীতল? তাই আমার প্রেমিক চলে গেছে, এবং বিয়েও ভাঙবে?বিয়ের পরেই সিলভাসা চলে গেলাম।ওখানে একটা স্কুলে চাকরীও পেয়ে গেলাম।কিন্তু যা হওয়ার তাই হল। বেশিরভাগ স্বামীর মতই আমার স্বামীও বুঝলেন না বা বলতে পারি বুঝলেও পাত্তা দিলেন না, উনি ওনার প্রোয়োজন মিটিয়ে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পরতেন। আমি সারা শরীরে যন্ত্রণা নিয়ে একটা  লাশের মত শুয়ে থাকতাম। কিন্তু কতদিন সহ্য করতাম? ছেলে পুলে ছিলোনা আমাদের দু বছরের দাম্পত্যে। তাই দার্জিলিং এর একটা রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে চাকরী পেতেই মিউচুয়াল ডিভোর্সে রাজী হয়ে গেলাম। বললাম,’কাগজ পত্র পাঠিও, দরকার মত সই করে দেবো।‘

তারপরে তিস্তা দিয়ে কত কিউসেক জল বয়ে গেলো। আমার জীবন সুন্দর চলছে। ছাত্র- ছাত্রী দের ভালোবাসায়। কখনো কখনো মন খারাপ হয়, কিন্তু আমার ঘরের লাগোয়া ব্যালকনি থেকে কুয়াশা মুক্ত আকাশের ফাঁকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পেলেই সব মন খারাপ কেটে যায়।

2

Advertisements