1

সে একটা সময় ছিলো, যখন পাড়া মানেই নিজের বা অন্যের ভাগাভাগি ছিলো।নিজের পাড়া, এক বিরাট যৌথ পরিবার ছিলো। সেখানে শাসন করার জেঠু আর ভালো রেজাল্ট করলে সবার আগে মিষ্টি খাওয়ানো জেঠিমা, কাকিমা ছিলো। সামান্য ভুল করলে চোখ রাঙানোর দাদা আর দিদির সাথে নিষিদ্ধ আনন্দ শেয়ার করার জায়গা ছিলো। নিজের বলে কিছুই ছিলোনা তবু ভালোবাসার মত একটা নিজের পাড়া ছিলো।

তবে সব ই তো সুখের নয়, কিছু মন খারাপ করিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ছিলো। আমাদের বাড়িটা বানাতে বাবার কাছে শুধু দেনা আর মাসের শেষ এর কথা ছাড়া কিছু ছিলোনা। বাবা আলাদা হয়েছিলো ঠাকুমা আর কাকাকে নিয়েই।বাবা সংসারের স্বার্থে নৈহাটি তে কলেজের সামনে একটা  পান, সিগারেট, বিস্কুট এর দোকান চালাতো, সারাদিন আর রাতে রেলের খালাসীর চাকরী।জেঠু এবং তার পরিবারে চার ছেলে মেয়ে, সব্বার দায়িত্ব বাবার ছিলো। মেজ জেঠু বিয়ে করেই আলাদা হয়ে গেছিলো।রিউমেট্যয়েড আরথ্রারাইটিসের পেশেন্ট ছিলো বাবা।দেশ ভাগ, বাবা নেই এমন সংসারের ছেলে আমার বাবার শৈশব খুব কষ্টের ছিলো।আইস্ক্রিম বিক্রি করা থেকে নিয়ে জত রকম কাজ হয় বাবা করতো দুটো পয়সার জন্য। শালুকপুরে এসে বাবা কাকাকেই দোকানটা দিয়ে দিলো।কাকাও ছিলো স্বার্থপর, কাঁচা টাকা পেয়েই জমাতে শুরু করলো।ঠাকুমা তাঁর সব ছেলের বৌ ই সুন্দরী, মানে (ফর্সা) গায়ের রঙের বৌ এনেছিলেন, মেজবৌ ছাড়া। তো কাকার জন্য ও ঠাকুমা ফর্সা সুন্দর গরন মেয়ে আনলেন।ঠাকুমা তার জন্য বোধ হয় সারা জীবন নিজেকে মাফ করতে পারেন নি। প্রচন্ড মুখরা আর হিংসুটে ছিলো কাকিমা।কাকার জন্য ঘর ছেরে বাবা বাইরে শুতো, কিন্তু ওনাদের মধ্যে কৃতজ্ঞতা বোধ বলে কোন বস্তু ছিলোনা।একটা ছেলে হওয়ার পরেই আমাদের পাশেই জমি কিনে কাকা বাড়ি বানিয়ে উঠে গেলো।কাকিমার যা যোগ্যতা তাতে বোধ হয় ভালো ঘর আশা করে নি, তাই অপ্রাত্যাশিত বৈভবের মালিক হয়ে ওনার মধ্যে ধরা কে সরা জ্ঞান করার প্রবনতা হয়েছিলো। কি করে লোক কে বোঝাবে যে উনি বড়লোক, তাই সারাক্ষন মেজাজ দেখাতো।নিজের ছেলে কে অমানুষিক মার, চিৎকার এই সব করে পুরো পাড়ার লোক কে ব্যাতিব্যাস্ত করে রাখতো।মনে হতেই পারে বেশ তো পাড়ার  গল্প করছিলে তার মধ্যে এরা কেন? এখানেই আসে পাড়ার কথা।

2

আমাদের পাড়ার বেশিরভাগ লোক ই রেলে চাকরী করতো। বাবা যখন সুস্থ তখন অফিস, মাছ ধরা, নাটক দ্যাখা নিয়ে নিজের মত মেতে থাকতেন। মা ছিলো বাচ্চা সামলানো, ঠাকুমার দ্যাখা শোনা এবং ঘরের কাজের জন্য এবং অসুখে বাবা যখন কখনো ছ’মাস কখনো একবছর হাসপাতালে থাকতেন তখন রোজ সকাল থেকে রাত হাসপাতালে পরে থেকে বাবার সেবা করা।সেই সময় আমাদের দ্যাখা শোনা করতো পারার জেঠু- জেঠি, কাকা- কাকিমার দল। ঠাকুমা তো কাকিমার ভয় এ আমাদের ঘরেও আসতে পারতোনা, তাই নৈহাটি চলে যেত জেঠুর কাছে।

আমাদের পাশেই থাকতেন ব্যানার্জী জেঠু আর জেঠিমা। ওনাদের কোন ছেলে পুলে ছিলোনা।কিন্তু জেঠু- জেঠিমার  মত মানুষ খুব কম ই দ্যাখা যায় আজ ও।বাবা যখন হাসপাতালে তখন জেঠিমার বাড়িতেই খেতাম নইলে মা খালি ভাত রান্না করে রেখে যেতো জেঠিমা মাছ, তরকারি এই সব দিয়ে যেতেন। জেঠিমার চোখ খুব খারাপ ছিলো, মোটা কাচের চশমাতেও প্রায় কিছুই দেখতে পেতেন না। সামান্য সমস্যাতেই জেঠিমা আগে আমার মা কে ডাকতেন, ‘দেখোনা গো , কি হিয়েছে?’ জেঠু প্রায় ই সন্ধ্যাবেলায় আমাদের দেশ- বিদেশের গল্প শোনাতেন। আমাদের গ্রামটা ছিলো হদ্দ গ্রাম, রাস্তা, হাস্পাতাল বা ডাক্তারখানা, ইলেকট্রিসিটি কিচ্ছু ছিলোনা।তাই রেডিও ছিলো একমাত্র মাধ্যম। ব্যানার্জী জেঠুই একমাত্র যিনি ইংলিশ, হিন্দি খবর শুনতেন। আমাকেও শুনতে বলতেন।

3

একবার বাবা প্রায় একবছর হাসপাতালে ছিলেন। বাবার বেসিক স্যালারীটাই পাড়ার কোন জেঠু বা কাকা তুলে দিয়ে জেতো।পুজোয় বাবা কে কিছুদিনের জন্য বাড়িতে এনেই আবার লক্ষী পুজোর পরের দিন ই হাসপাতালে পাঠাতে হয়েছিলো।সেই বার একটা সাধারন জামাই বাবা কিনে দিয়েছিলো।জেঠীমা প্রতি বছর পুজোয় ওনাদের সাবেক বাড়ি বেহালায় চলে যেতেন। জেঠু মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতেই খেতেন। কালি পুজোয় বাজি তো দূরের কথা একটা প্রদীপ ও জ্বালাতে পারিনি, আর সেখানে এক ই উঠোনে খুড়তুতো ভাই বাজীর পর বাজী পুড়িয়ে যাচ্ছে। কাকা- কাকিমা একবার ও আমাদের ডাকেনি। আমার থেকেও বোধহয় ভাইয়ের ই বেশি খারাপ লাগছিলো।কারন এমনিতেও আমি বাজী পোরাতাম না। পরের দিন জেঠু বিরাট একটা মাছ, মিষ্টি আর বাজী এনে বলেছিলেন, ‘বৌমা, আমি আজ দুপুরে তোমাদের বাড়িতেই ডুতো ভাত খাবো।‘

মা লজ্জায় লাল হয়ে বলেছিলো, ‘দাদা, আপনি খাবেন বলে মাছ, মিষ্টি এইসব কিনে আনলেন? আমাদের যা জুটতো তাই দিয়েই কি আপনাকে এক বেলা ভাত খাওয়াতে পারতাম না?’

জেঠুর সেদিনের কথা আমার আজ ও মনে আছে, ‘তোমায় বৌমা ডাকলেও তুমি আমার মেয়ের মতন মা। আমি কি ছোট দুটো বাচ্চা কে উতসবের দিনে একটু, ভালো- মন্দ খাওয়াতে পারিনা? ওরা আমায় জেঠু ডাকে; জেঠুর কর্তব্য তো কিছু থাকে।‘

বন্ধু সুসময়ে অনেক পাওয়া যায়, কিন্তু বিপদের দিনে আসল বন্ধু কে চেনা যায়।

4

HEADER IMAGE BY: RUMA CHAKRABORTY

Advertisements