6

ছোট থেকে জঙলের গ্রামে থাকার জন্যই হোক বা বিভূতিভুষন এর বইএর গুণেই হোক আমি প্রত্যেক ঋতুর আলাদা গন্ধ পেতাম, এখন শহরবাসী আমি তবু মাঝে মধ্যে সেই গন্ধগুলো খুঁজতে থাকি।

শীত মানেই কুয়াশার, গেঁদা ফুলের, কমলালেবুর সাথে ধুলো ওরা গোধুলির মিক্সচার গন্ধ। নতুন উলের, পন্ডস ক্রিমের, মায়ের গায়ের তুহিনা, বসন্ত মালতীর গন্ধে মেশানো আমার শৈশবের ছুটির গন্ধ। সময়ের সাথে সাথে হারিয়েছে কত কিছু, পেয়েছিও অনেক তবু…

1

আমার মা প্রথম উল বোনা শিখে আমাকে একটা সি গ্রিন আর ওরেঞ্জ কম্বিনেশনের কার্ডিগান বানিয়ে দিয়েছিলো। সেইটা পরে আমি মা- বাবার সাথে জীবনে প্রথমবার চিড়িয়া খানায় বেড়াতে গেছিলাম। মা শুধু কাঁটা কেন ক্রোশে নিডলের কাজ ও খুব ভালো জানতো। আমার কাছে এখনো মায়ের হাতে বোনা সোয়েটার, ক্রোশে বোনা নরম সোয়েটার আছে। এখন আর কেউ বোনেনা। সবই কিনে পরতে হয়। এই কেনা সোয়েটার  ঊষ্ণতা দিলেও ভালোবাসার গন্ধ লাগানো থাকেনা।

 মা যখন সোয়েটার বোনা শিখলো তখন আমার সব দাদা, দিদি, জেঠু, বোন, ভাই লাইন দিয়ে থাকতো। প্রতিবছর দুর্গা পুজোর পর থেকেই মায়ের হাতে নতুন উল আর নানারকম কাঁটা দেখতে পেতাম।তারমধ্যে বাবার অফিস কলীগের ছেলে মেয়েকেও সোয়েটার বানিয়ে দিতে হত, বাবার আবদারে কিন্তু পারিশ্রমিক ছাড়া।তখন জগত এতো ব্যাবসা বুদ্ধিতে চলতোনা। টাকার ঊর্ধে ভালোবাসার সম্পর্কের দাম দিতে জানতো মানুষে।

3

আমাদের পাশের বাড়ির যে প্রতিবেশীর বাচ্চা কে মা বিনা পয়সায় নিজে উল কিনে নানারকম সোয়েটার বানিয়ে পরাতো সেই কাকিমা যেদিন নিজে উল বোনার মেশিন কিনলেন বলেদিলেন যে ওনার কাছ থেকে টাকা দিয়েই কিনতে হবে। তখন বুঝেছিলাম মানুষ এখন সত্যি টাকার মূল্যে বিচার হবে।

বাদ দাও। আসলে ছোটবেলার শীতে পিকনিক ও কিন্তু সমান গুরুত্বপূর্ন ছিলো। পরীক্ষা শেষের বন্ধুদের সাথে যে কোন এক বন্ধুর বাড়ির পিছনের বাগানে কখনোবা নিজেদের বাগানে আমরা কুচোকাচারা পিকনিক করতাম। সে খুব মজার ব্যাপার হত। রান্না তো দূরের ব্যাপার কার সাথে কি মেশালে খাবার হয় তাই জানতাম না। ফলে আমাদের ই কারো মা খিচুড়ি বানিয়ে দিতো আর তাই নিয়ে বাগানে পিঠে রোদ মেখে বন্ধুদের সাথে হাহা হিহি করতে করতে খাওয়াটা যে কি আনন্দের হত!এর পরে থাকতো বাবার অফিসের পিকনিক। সেটা কখনো ব্যান্ডেল চার্চ তো কখনো ডায়মন্ড হারাবার। ওই পিকনিক তা বেশ জমজমাট লাগতো। আমি বড় হয়ে একটা পিকনিক অর্গানাইজ করতাম আমাদের দোতলার ছাদে মহালয়ার রাতে। এটাও পাড়ার কিছু বৌদি, দিদি, কাকু, কাকিমা, জেঠিমা মিলে হত। এই পিকনিক এর খাসির মাংস বাবা নিজে কিনে আনতো আর নিজেই রান্না করতো। এটাতেও ব্যাপক হুল্লোড় করতাম, বক্সে এ মিউজিক চালিয়ে নাচ হত। অনেক রাতে খাওয়া।

2

এখন শীত  আসে যায়। সব্বাই চলে গেছে সময়ের আড়ালে। মৃত্যু কেড়ে নিয়েছে বাবা, জেঠিমা কে। টাকার গরমে পলি পরেছে পাড়ার প্রিয় দিদি, বৌদির সাথে। আছে পুরোনো এ্যালবাম আর আমার একাকীত্ব। মনের খবর কে রাখে?

Advertisements