স্কুল জীবনে কিছু নিয়ম আমরা সবাই খুব বিশ্বাস করতাম; তার মধ্যে প্রধান ছিলো পরীক্ষার রেজাল্ট আউটের দিন এক শালিখ না দ্যাখা আর সরস্বতী পুজোর আগে কুল না খাওয়া। প্রতিবছর ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট বেড়োতো চব্বিশে ডিসেম্বর। সেইদিন সকালে চোখ খোলার আগে মা কে ডাকতাম। চিল্লিয়ে বাড়ি মাথায় তুলতাম জতক্ষন মা না আসে। চোখ খুলে প্রথমে মায়ের মুখ দেখলে ভয়ের মধ্যেই কেমন যেন একটা শান্তি শান্তি ভাব থাকতো মনে।স্কুলের পথে পুর রাস্তাটাই চোখ নিচু করে চলতাম। আর যদি সামনে পরে যেতো দুটো শালিখ পাখি তাহলেই কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রনাম করেই মনে মনে বলতাম, ‘ দুই শালিখ তোর পায়ে পরি/ পরীক্ষায় যেন পাশ করি।‘ সারা বছরের পড়া শোনা, আত্মবিশ্বাস গিয়ে হাতে থাকতো দুই শালিখের আশির্বাদ। কুল খেতাম না, অবশ্য আজ ও খাইনা। সরস্বতী পুজোর আগে কুল খেলে পরের বছর ডাহা ফেল। অতএব কুল খাওয়া যাবেনা।

2

এখন কার বাচ্চারা অত বোকা বা সরল নয়, ওরা কনফিডেন্ট, শালিখের পরোয়া করেনা। আমাদের অহেতুক ভয়ের  গল্প শুনে হাসে। আমরা কিন্তু অনেক সাদাসিধে ছিলাম।বুদ্ধীমান হয়েও সারল্য ছিলো। ট্রেনে, বাসে বসার জায়গা না পেলে কোন কাকু বা জেঠু নিজেরা চেপে চুপে বসে খানিক টা বসার জায়গা করে দিতেন। কোন ক্লাসে পড়ি জিজ্ঞাসা করতেন।এখন কেউ অপরিচিতর সাথে সহজ হতে পারেনা; উপায়  ও নেই। কে ভালো আর কে যে টেররিষ্ট বা পাচারকারী জানিনা তাই নিজের সন্তান কে ছোট থেকেই জ্ঞান বৃক্ষের ফল খাওয়াই। কেউ নাম জিজ্ঞাসা করলে বা কিছু জিজ্ঞাসা করলে বলবে না। বাচ্চা জিজ্ঞাসা করে, ‘কেন বলবো না?’ উত্তর একটাই সময় খারাপ, মানুষ খারাপ। সাবধানে থাকতে থাকতে বেচারা শিশু তার শৈশব হারিয়ে ফেলে।

আমাদের শৈশবে এতো কিছু ছিলোনা, যা ছিলো তাও কিনে দেওয়ার সঙ্গতি ছিলোনা তবু আমাদের কাছে এই প্রজন্মের শিশুদের থেকে বেশি সম্পদ ছিলো। আমাদের ঠাকুমার লুকিয়ে দেওয়া কুড়ি পয়সা ছিলো, বমমার কাছে মা বকেছে বলে আদর পাওয়া ছিল, গল্প বলার ঠাকুমা আর বসে শোনার জন্য জ্যোৎস্না ভরা ঊঠোন ছিলো, গরম কালে কেনা নয় মায়ের হাতে বানানো আমপোরার  শরবৎ ছিলো। আমাদের পাশের বাড়ির কাকু, জেঠুদের শাসন এবং আদর ছিলো।জীবন কে টাকা পয়সায় মাপতে জানতাম না বলেই বোধ হয় অনেক বছর শিশু ছিলাম।এই প্রজন্ম বাবার স্যালারি জানে, কোন গাড়ির জন্য কত ডাউন পেমেন্ট দিতে হয় তা জানে, নিজের বাবা- মা কে ততটুকুই ভালোবাসে যতটা দিলে চাহিদা মেটে। পিতজা- বার্গারের কাছে পিঠে পুলির দাম নেই। সেই সব ঠাকুমা, দিদিমাও আর হয়না।রং করা চুলে কে ঠাকুমা? সবাই আন্টি!

download

আমি কিন্তু আজ ও কোন সকালে হঠাত দুই শালিখ দেখলে সেই ছোট বেলার মত হাত দিয়ে কপাল ছুঁয়ে প্রনাম করে যেই বলি দুই শালিখ তোর পায়ে পরি/ পরীক্ষায় যেন পাশ করি, দেখি শালিখ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়, তাইতো? জীবনের পরীক্ষায় তো নিজেকেই পাশ করতে হয়!

Advertisements