3

আমি যে গ্রামে থাকতাম সেইখানে সব খারাপের মধ্যে একটা ভালো গুন যেটা পেয়েছি, তা হল, প্রাকৃতিক সৌন্দর্জ উপোভোগ করার মত চোখ আর মন তৈরী হওয়া।আমাদের সেই নাম না জানা গ্রামে কি ছিলোনা, জঙল, সাপ, বিছে, আবার অপু- দুর্গার মত আমি আর ভাই নানান অদ্ভুত জিনিশ খেতাম। যেমন গন্ধরাজ লেবু। প্রচুর ফলতো। গরমের দুপুরে না ঘুমিয়ে আমি আর ভাই পাকা গন্ধরাজ লেবু মেখে, নুন কাঁচা লংকায় মিশিয়ে খাওয়া। জলপাই, আমড়া, পেয়ারা গাছে চড়ে পেয়ারা খেয়ে গাছের ডাল ধরে ঝুলে টার্জানএর মত দোল খাওয়া।

গ্রামের মানুষ রা বড্ড কুচুটে হয়; তাই গাছ, ফুল, ফলের সাথেই বন্ধুত্ব ছিলো আমার।আমার তো কোন বন্ধু ছিলোনা, তাই একা একা স্কুলে যাওয়ার পথে আমি অনেক কিছু দেখতাম। ছোট্ট ঘাস ফুল বা বনকুল কিছুই বাদ যেতো না।

আরেকটা জিনিষ ও ছিলো, সে সব তো তোমরা বিশ্বাস করবে না, তবু বলি, আমাদের গ্রামে অনেক ভুত ছিলো। শ্যাওড়া গাছ ছিলো তাতে শাঁকচুন্নি ছিলো। মামদো ভুত ছিলো আমাদের গ্রাম ছাড়িয়ে বামুন পাড়ায় যাবার রাস্তার পাশের বাঁশের ঝারে।রাত্রি বেলায় হাহা করে হাসতো কে জানে কারা? আমরা ভয়ে গুটিয়ে থাকতাম।

1

আমাদের গ্রামে তো আর ইলেকট্রিসিটি ছিলোনা, তাই কেরোসিনের আলোয় পড়া শোনা। অনেকখানি জমি ছিলো আমাদের, দেড় কামরার ঘর আর জমির শেষে পায়খানা করার জায়গা। প্রায় রাতেই আমার পেতো, মা বকতে বকতে হলেও হ্যারিকেন নিয়ে দাঁড়াত , আমি কোন দিকে না তাকিয়ে তাড়াতাড়ি সব কাজ সেরে ফিরতাম। উফ! ছোট্ট বুকটা ধুক পুক করতো ভয়ে।

মাঝে মাঝেই চোর এসে যাদের মাটির বাড়ি ছিলো তাদের ঘরে সিঁদ কাটতো। সকাল বেলায় গোলমাল শুনে দৌড়ে গিয়ে দেখতাম এই এত্তোবড় গর্ত।চোরেরা গায়ে তেল মেখে আসতো। তাই ধরা পরতো না। অবশ্য কারো ঘরেই তেমন টাকা কড়ি থাকতোনা। ঐ হয়তো দুটো নারকেল, লাউ, কুমড়ো এই সব ই চোরে নিয়ে যেতো বেচারা!

দুর্গাপুজার আগে আসতো ডাকাত। দু এক জন বড়মানুষের বাড়িতেই আসতো।একবার ডাকাত আমাদের পাড়ার এক লোক কে ডাকাতি করতে এসে গুলি করে মেরে ফেলেছিলো।তারপর থেকে তো আবার সেই গুলি খাওয়া ভুতের উপদ্রব শুরু হল।মাঝে মাঝে কাউকে আবার নিশিতে পেতো। নিশির কথা জানো?সে খুব আজব ভুত। অনেক রাতে যখন কেউ গভীর ঘুমে তখন তার কোন বন্ধুর মত গলা করে ডাকতো। যদি কেউ একডাকেই, ‘যাই’ বলতো, ব্যাস সে ঘর থেকে বেড়িয়ে খালি ঘুরতে থাকতো। রাগী নিশি হলে মানুষ কে মেরেও ফেলতো।আমি অবশ্য কাউকে মরে যেতে দেখিনি; কিন্তু নিশিতে পাওয়া মানুষ দেখেছি।জেখানে নিশি পাওয়া মানুষ কে পাওয়া যেতো সেটা হয় কোন পুকুর পাড় নইলে বাঁশ ঝারের মধ্যে।

2

একটা খুব প্রাচীন বট গাছ ছিলো, কত বয়স কেউ জানে না। কেউ বলতো তিন শো বছর কেউবা আরো বেশি ই বলতো।দিনের বেলায় ও অখান দিয়ে আসতে ভয় লাগতো। একবার খুব বৃষ্টি। ভাই আর মা খুব দরকারী কোন কাজেই নৈহাটি গেছিলো। বাবার অসুখ বলে আমি ই বাড়িতে বাবার কাছে ছিলাম। অত বৃষ্টি স্টেষনে নেমে মা ভাইকে বলেছিলো তুই দৌড়ে বাড়ি জা।আমাদের গ্রামে ঢুকতেই ওই বটগাছ তলা পেরোতে হত। ওই খানে ভাই পৌঁছে শোনে আ-আ-আ- করে আর্তনাদ। ও তো ভয়ে আরো জোরে দৌড়। ওর অনেক পিছনে ছিলো মা। মা ও শুনেছিলো সেই হাড় হিম করা আর্তনাদ। অনেকেই নাকি শুনেছে সেই ডাক, কিন্তু আজ ও কেউ জানে না, কে চিৎকার করতো ওখানে।

সে যাক গে, যা বলছিলাম, তোমরা যেন আবার ভয় পেয়োনা, তাহলে আমাদের গ্রামের তেপান্তরের মাঠের গল্পই আর কোন দিন করা হবে না।সে খুব ভয়ংকর গল্প। যদি শুনি কেউ ভয় পেয়েছো, তাহলে আর হয়তো কোনদিন  বলা হবেনা।

Advertisements