লিলি কে ওর মা- বাবা ভালো মেয়ে বানাতে চেয়েছিলেন এবং মেয়ে তাই হয়েছে।লিলি পড়া  শোনা, নাচ, গান, আবৃত্তি, তে বরাবর জেলার সেরা এবং বাধ্য মেয়ে।তেইশ বছর বয়সে হাতে এম এস সির ডিগ্রী, ক্লাসিক্যাল, রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল গীতি তে সঙ্গীত বিশারদ, সঙ্গীত  ভাস্কর ডিগ্রী। অবশ্য ডিগ্রীর কাগজ না দেখিয়েও ওর গলা শুনেই মানুষ বোঝে। দেখতে, শুনতেও খারাপ নয়; সুন্দরী না হলেও আকর্ষনীয় তো  বটেই ।লিলির বাবা- মা দু জনেই সরকারী চাকুরে, মা মেট্রো রেল এ আর বাবা ব্যাংকে।

2

টাকা পয়সার সাথে যদি রূপসী এবং গুনী মেয়ে হয় তার জন্য পাত্রের অভাব হয়না। লিলির জন্য ভাল ভালো সম্বন্ধ আসতে থাকলো। আগেও আসতো কিন্তু তখন ওর মা- বাবা গরজ করতো না কিন্তু এখন তাঁরাও মনযোগী হলেন, আর তাঁদের অবাক করে প্রথম বার লিলি না বললো।

কি ব্যাপার? তুই কি কাউকে পছন্দ করিস, মা জিজ্ঞাসা করলো।

না।

তবে? প্রবলেম টা কি?

আমি বিয়ে করবো না।চাকরী করবো।

সে তুই চাকরী করবি। আমিও তো চাকরী করি, তা বলে কি বিয়ে করিনি?

কিন্তু লিলি গোঁজ হয়ে বসে থাকলো।

সারাজীবন বাধ্য মেয়ের আজ এই তীব্র বিরোধীতা মা- বাবা কে খানিক টা অবাক করলেও ওনারা তেমন পাত্তা দিলেন না।

লিলির মায়ের নাম মল্লিকা আর বাবা বিনায়ক। বিনায়কের বাবা ছিলেন এই তল্লাটের নামজাদা ডাক্তার। ওনার মত মানব দরদী খুব কম ই দ্যাখা জায়।গরীবের বিনা পয়সায় চিকিতসাই শুধু না, ওষুধ, পথ্যের ব্যাবস্থাও করতেন। এলাকার বহু মানুষ আজ ও ওনার  নামে কপালে হাত ঠেকিয়ে নমস্কার করেন।সব রাজনৈতিক দল ই ওনাকে এলাকা থেকে ভোটে দাঁড়াতে বলেছিলেন। কিন্তু উনি নিজের কাজ ছাড়া আর কিছুর সাথেই জড়ান নি।ওনার হয়তো মনে হয়েছিলো যে মানব কল্যান করার জন্য রাজনীতি তে না জড়ালেও চলে।বিনায়ক একমাত্র সন্তান হলেও ওকে ডাক্তার হওয়ার জন্য বলেন নি। ছেলের কমার্স নিয়ে পড়া, ব্যাঙ্কে চাকরী নেওয়ার সিদ্ধান্ত কে খুশি মনে মেনে নিয়েছিলেন।এমন কি মল্লিকার চাকরি করা নিয়েও ওনার কোন অনুযোগ ছিলোনা। লিলির যখন পাঁচ বছর তখন ঘুমের মধ্যেই স্ট্রোক হয়ে মারা যান।

3

আজ রবিবার, ছুটির দিন।সকালে আয়েস করে চা খেতে খেতে বাপ, মেয়ে পেপার পড়ছিলো। রবিবার এ গোটা তিনেক ইংলিশ আর দুটো বাংলা কাগজ নেওয়া হয়।পড়তে পড়তে বিনায়ক বাবু লিলি কে জিজ্ঞাসা করলেন, কি বুঝছিস?

কিছুই না বাবা। আজকাল আমি পেপারে ডেট না দেখে বুঝতে পারিনা, এটা আজকের না গতকালের?

মানে? চোখের চশমাটা ঠিক করতে করতে বিনায়ক বাবু মেয়ের দিকে তাকালেন।

লিলি নিজের উমনো ঝুমনো চুলে ক্লিপ আটকাতে আটকাতে বললো, ‘রোজ ই তো এক খবর, খুন, ঝগড়া ছাড়া কিছু নেই।‘

যা হচ্ছে, তাই তো ছাপবে, বাবার মুখে শুনে বললো, ‘না বাবা, এমন অনেক কিছুই আছে যা না ছাপলেও চলে, এবং অনেক ঘটনা আছে যা এরা নিজেদের স্বার্থে এড়িয়ে যায়।‘

বিনায়ক ও মানেন কথাটা তবু মেয়ের মুখ থেকে এই কথায় একটু অবাক হলেন। কবে এতো ম্যাচিওর হয়ে গেলো? ও তো নিজের স্টাডি, নাচ, গান নিয়েই থাকতো! সে যে নিজের মত করে ভাবে, নিজস্ব মতামত আছে কোনদিন বুঝতে দেয়নি তো!দু এক সপ্তাহ পরেই লিলি জানায় ও একটা ফরেন ফান্ডিং এজেন্সীর প্রোগ্রাম  অফিসার হিসেবে জব জয়েন করতে চলেছে। বিনায়ক, মল্লিকা আকাশ থেকে পরে। কবে ইন্টারভিউ দিলি? কিসের কোম্প্যানী? লিলি জানায় ওর সংস্থার ব্যাপারে। এটা আমাদের দেশের বেশ কিছু এন জি ও কে ফরেন ফান্ড দেয়। নানা রকম প্রোজেক্ট এর জন্য ফান্ড আসে, কেউ চাইল্ড রাইটস নিয়ে কাজ করে কেউ বা ভবঘুরে দের নিয়ে। যখন যেই প্রজেক্টের  কাজে ফান্ড আসবে তখন কোন সংগঠন সেই বিষয়ে কাজ করে, তাদের ন্যাশানাল ফান্ডের পাঁচ বছরের বেশি কাজ হয়েছে কিনা, অডিট ফাইল চেক করে তারপরে ফান্ড দেওয়া এবং প্রোজেক্ট টা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ করা। প্রচুর ফিল্ড ভিজিট, এবং প্রয়োজনে দেশের বাইরেও সেমিনার এ যেতে হতে পারে।ইন্টার ভিউ অনলাইন এ দিয়েছে,  ফোনে  ভাইভা এক প্রস্থ হয়েছে এখন ফাইনাল ভাইভার জন্য দিল্লী যেতে হবে।এতো কিছু হয়ে গেছে আমাদের একটা মতামত নিলিনা? মল্লিকার গলার থেকে বিস্ময় এবং ক্ষোভের সাথেই কথা গুলো বেড়িয়ে আসে।

লিলি মা কে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘এখনো তো পাকাপাকি কিছু হয়নি, আগে সিলেক্ট হই তবে না, মা!’

মল্লিকা মেয়ের হাত সড়িয়ে চলে যান, কোথাও একটু তাল কেটে গ্যাছে বোঝে লিলি কিন্ত চুপ থাকে।

রাতে নিজের ঘরে গিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে ওর পছন্দের ব্যালকনিতে বসে লিলি ভাবতে থাকে।সেই কোন ছোট থেকে বাবা মায়ের মনের মতন হতে হতে ওকে যে ওর বাবা মা পুতুল ভেবে বসে আছে সেটা এখন বুঝতে পারে। কিন্তু আমি তো একটা স্বতন্ত্র মানুষ, আমার ও তো নিজের কিছু চাওয়া পাওয়া থাকতে পারে সেটা কেন আমার চাকরি করা মা বুঝতে পারেনা!

4

পরের কিছু দিন হুস করে কেটে যায়, ফাইন্যাল ভাইভার জন্য রাজধানীর টু টিয়ারের আপ- ডাউনের টিকিট এসে যায় কোম্প্যানির তরফ থেকে।ও যে সিলেক্টেড তা বুঝতে পারে। এখন কিছু দিন অপেক্ষা তারপরে নতুন জীবন শুরু হবে।

বিনায়ক বাবু জতই খুশির ভান করুন মনে মনে কোথাও যেন নিজেকে হেরো মনে হচ্ছে, মল্লিকা তবু রাগ অভিমান দেখিয়েছেন কিন্তু ভালো মেয়ের ভালো বাবা ইমেজ থেকে বিনায়ক বাবু আর বেরোতে চান না। নিজের বাবার কথা ভাবেন, ওই রকম উদারমনস্ক বাবার ছেলে হয়েও উনি যে আসলে স্টিরিওটাইপ বাবা ই রয়ে গেছেন এটা বুঝলেও মানতে পারেন না।

লিলির যাওয়ার ডাক এবং ট্রেনের টিকিট এসে জায়।মল্লিকা বলেন, আমরাও যাই, তোর থাকার জায়গা দেখে, গুছিয়ে দিয়ে আসি আসলে উনি এখনো ভাবতে পারছেন না মেয়ে একা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, একা থাকবে, চাকরী করবে কিন্তু লিলি হাসি মুখেই মানা করে। আপাতত কোম্প্যানী গেষ্ট হাউস এই থাকবে তার মধ্যেই কোন ওয়ার্কিং উওম্যান হোষ্টেল খুঁজে নেবে বা ফ্ল্যাট ভাড়া নেবে কিন্তু যে টা নেবেনা সে টা মা- বাবার সাহায্য। ও দেখতে চায় নিজের ডানার জোর কত টা।

 

Advertisements