‘দূর করে দে বাড়ি থেকে, ওকে আমি ডেকেছি না কি?’ এমন বিষ যে কারো জিভে থাকতে পারে রাকা এই দু মাস আগেও জানতো না।রাকার বিয়ে হয়েছে গত ডিসেম্বরে, রীতিমত সম্বন্ধ করে বিয়ে দিয়েছেন ওর বাবা- মা।ওর বর ঋজু তিন বোনের একমাত্র ভাই, রাকা এক ভাই এক বোন।ঋজুর বড় দুই দিদির বিয়ে হয়ে গেছে আর ছোট বোন আছে। সে খুব ছোট ও নয়, রাকার ই বয়সী কিন্তু এখনো গ্র্যাজুএশন কমপ্লিট করেনি; সেখানে রাকা এম এর ফাইনাল এক্সামের পরেই বিয়ে হয়ে গেছে।ঋজু চাকরি করে সিলভাসায়। ও বিয়েতে পণ নেয়নি। পণ কেন কিছুই নেয়নি।

 

বিয়ের সাতদিনের মধ্যেই বৌ নিয়ে চলে গেছিলো সিলভাসায়।সেখানে একটা ছোট ঘর আর বিশাল ছাদ নিয়ে ওদের নতুন সংসার।ঋজুর মত কোয়ালিফায়েড ছেলে কিন্তু খুব অল্প মাইনের চাকরী করে। রাকার বাবা একটা ভুল করেছেন। মেয়েকে বলতে গেলে একদম এককাপড়ে বিয়ে দিয়ে ছেন।ভদ্রলোকের সব ভালো কিন্তু বোকা। পাত্র কিছু নেবেনা বলেছে তবু মেয়ের নতুন সংসার শুরুতে যে কিছু হেল্প করতে হয় সেটা উনি বেমালুম ভুলে গেছেন। কিছু নেবেনা তাহলে খাওয়া দাওয়ায় খরচ করি।বিয়ের পরের দিন মেয়ে কি শাড়ি পরবে, এটাও ভুলে গেছেন।বেনারসী আর একটা পাটোলা শাড়ি ব্যাস! গয়নাও তেমন কিছু দেননি।

বৌভাতের দিন সকালে প্রথম বোমা ফাটালো ওর ছোট  ননদ। ঋজুর ছোড় দি কে জিজ্ঞাসা করার নামে রাকাকে ঠেস মারলো, ‘বাড়ি দেখে মনে হচ্ছে না রে ছোড় দি, যে ছেলের বিয়ে হয়েছে!’রাকা প্রথমে অত বুঝতে পারেনি।বোকা বাপের বোকা মেয়ে।কিছুক্ষন পরেই ওর মেজো ননদ ঝগড়াটে মহিলার মত বললো, ‘এই! তোমার মা এতো মিথ্যেবাদী কেন?’

3

রাকা আকাশ থেকে পরেছে ভাষা শুনে! কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করায় বললো, ‘তোমার কত সাইজের ব্লাউজ লাগে?’

রাকা জানেনা। ও বিয়ের আগে দু একবার শাড়ি পরেছে, কিন্তু তাতে ব্লাউজ নয়, স্কার্ট ব্লাউজের টপ দিয়ে।ও বললো, জানি না তো?

তোমার মা যে বলল, চৌত্রিশ সাইজ লাগে? আমি দেখেই বুঝেছিলাম, অমন নিমাই মেয়ের চৌত্রিশ লাগতে পারেনা।

রাকার মনে হচ্ছিলো, ওকে যেন বাজারের মাঝখানে কেউ উলঙ্গ করে দিয়েছে! বাড়ি ভর্তি লোক তাদের সামনে,  কি ভাষা!

রাকা বরাবর  রোগা। খুব রোগা।কিন্তু তারজন্য কেউ কোনদিন এতো অপমান জনক কথা বলেনি। এই জন্যই তো ও চাইতো বিয়ে না করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে।কিন্তু ও এম।এ পড়ার সময়েই আত্মীয়- স্বজন, পাড়া পরশী এমন কথা শুরু করলো যেন কুড়ি বছরের পরে অবিবাহিত থাকা পাপ! মায়ের মুখ তোলো হাঁড়ির মত হয়ে থাকতো। এর মধ্যেই ওর ভাই চাকরি পাওয়াতে বানের জলের মত বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকলো। ও যেন তখন একমাত্র বাধা। ভাই গিয়ে আবার কোন এক আত্মীয়ের বাড়িতে বলেও এলো, এই মালগাড়ি না সরলে তো আমার মুক্তি নেই।সেই আত্মীয় আবার ওদের বাড়িতে এসে এক ঘর লোকের মাঝে সেই কথা বলে গেলো। রাকা দেখলো, তার এতো বড় অপমানেও বাবা বা মা ভাইকে কিচ্ছু বললোনা।অথচ রাকার মত গুণী মেয়ে একটু সময় পেলে ভালো একটা চাকরি পেতেই পারতো। সেই কোন ছোট বেলা থেকে ও কাগজে আর্টিকেল লেখে! চমৎকার গানের গলা! শুধু কালো আর রোগা বলেই যেন বাড়িতে ও ব্রাত্য।

শেষে এম।এর ফাইনাল হতে হতেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া।

 

তবু ঋজুর ভালোবাসায় একটা নতুন জীবন শুরু হয়েছে।ভুলে যাচ্ছে পুরোনো ক্ষত।কিন্তু হঠাত বিয়ে এবং এতো দূরে চলে এসে রাকার খুব মন খারাপ লাগতো। সেই জন্যই একবার বাড়ি আসতে চেয়েছিলো। ঋজু মানা করেছিলো। কিন্তু মা- বাবা ওকে দেখতে আসতেই ও বায়না জুড়ে দিলো। ওর বাবা আবার সাথে করে ওর ছোট ননদ টাকেও নিয়ে এসছেন।তার ব্যাবহার দেখেই রাকা ভয় পেয়ে গেছে। সে আলমারি ঘাঁটছে বিছানা দেখছে, কি খুঁজছে ভগবান  জানে।

হাওড়ায় নেমে রাকা মায়ের সাথে যেতে চেয়েছিলো।কিন্তু ওর ননদ বললো না, আগে তুমি আমাদের বাড়ি যাবে, সেদিন ছিলো রাকার জন্মদিন।শ্বশুড় বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই ও অবাক হল ওনাদের ব্যাবহারে।

এই যে, যাও, স্নান করে নাও।

স্নানের পরে একটা বিটকেল রঙের শাড়ি পরতে দেওয়া হল।মা মেয়ে গল্প করেই যাচ্ছে ও যে সামনে বসে আছে, তাতে পাত্তাও দিচ্ছেনা। ঘন্টা খানেক পরে চা দিলো।পাতলা, গরম জল।দুপুরের খাবার বলতে ভাত, আর মাছের এতো ছোট সাইজের টুকরো যা রাকার বাপের বাড়ির কাজের লোক ও পায়না।ভাত খাওয়া হতে না হতেই ননদ বললো, ‘তোমার মা আবার রাগ করলো না কি আমার কথায়?’

ওর শাশুড়ি কারন জিজ্ঞাসা করতেই ভালো মানুষের মত বললো, ‘মা, আসলে বৌদি তো আসতে চাইছিলোনা আমাদের এখানে, ওর না কি জন্মদিন!আমি  জোর করে আনলাম।‘

আর কি ওর শ্বাশুড়ির চিল চিৎকার শুরু হয়ে গেলো।‘দূর করে দে বাড়ি থেকে।।‘

রাকা অদ্ভুত টাইপের মেয়ে। কেউ কোনদিন ওকে কাঁদতে দেখেনি, রাগতে দেখেনি, কার ও সাথে ঝগড়া করতেও দেখেনি।নিজের কাজ নিয়ে থাকতো। কাউকে অপছন্দ হলে কথা বলা বন্ধ করে দিতো বা দূরে থাকতো।ওর ঠাকুমা কে দেখেছে, যিনি ভুলেও কোনদিন বৌদের গালি দেননি। শাশুরি বৌ এর ঝগড়াও দ্যাখেনি।ও তো জানতো শুধু লেখা-পড়া, গান আর কাগজে লেখা।বিয়ের পরে জীবন যে একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে যায়, তাও ছিলো অজানা।

একমাসের মধ্যে মাত্র সাতদিন ও বাপের বাড়ি তে থাকতে পারেনি; অবশ্য তখন তো দেখেও নিয়েছে ওর বাবা- মা ভাইয়ের বিয়ে ঠিক ই করে ফেলেছে।সত্যি মালগাড়ি ছিলো তাহলে? রোজ মুখ বুজে গালি খেয়েছে, ননদ ব্যাগ খুলে সব টাকা নিয়ে নিয়েছে, তারপরেও কি জান্তব উল্লাসে নিজের জন্মদিনের সব রান্না করিয়ে খালি হাতে বরের কাছে পাঠাবার ব্যাবস্থা করেছে।

ফিরে আসতেই ঋজু নানা ভাবে জিজ্ঞাসা করেছে, ‘কেমন ব্যাবহার করলো আমার মা?’

ভালো, খুব ভালো ব্যাবহার।

রোজ এক ই প্রশ্ন আর এক ই উত্তর শুনতে শুনতে ঋজু একদিন বলেই ফেললো, ‘কি করে আমার মা তোমার সাথে ভালো ব্যাবহার করবে?’

কেন, করবে না?

আমার মায়ের তো তোমাকে পছন্দই হয়নি!

তাহলে বিয়ে হল কি করে?

ওই আমার বাবার ইচ্ছে ছিলো বাঙাল মেয়ে আনবে, তাই।

তুমি কেন রাজি হলে?

আরে আমার বাবা তোমার বাবা কে এতোদিন লটকে রেখেছিলো।তারপরে আমার ঠাকুমাও বললো, তুই এতো দূরে চাকরী করিস, তাও প্রাইভেট এ, কেউ তো মেয়ে দিতে রাজি হয়না। এদের মেয়ে কালো, তাই হয়তো রাজী হয়েছে।এখানেই বিয়েটা করে নে।

রাকা খালি জিজ্ঞাসা করেছিলো, ‘আমি মরে গেলে তুমি বিয়ে করবে?’

হ্যাঁ কেনো, করবও না?

তারপরে রাকা আর কোন কথা বলেনি। অনেক ভেবেছে। বাপের বাড়ি তে ফিরতে ইচ্ছে হয়নি।শ্বশুড় বাড়ি এবং বাপের বাড়ি দু বাড়িতেই নিজের জায়গা কি বুঝে গেছে। কালো, কালো কত কালো! পৃথিবীতে আর কেউ কালো নেই।নিজেকে জিজ্ঞাসা করেছে, কেন বাঁচা উচিত? জবাব পায়নি। মা, যিনি জন্মদিয়েছেন তিনিও ওকে নিজের মত করে বাঁচতে দিতে চান নি। ডিসেম্বার থেকে মে,এই কয়েক মাসে তেমন টান ও তৈরি হয়নি বরের সাথে।

পনেরো দিন ধরে ভেবেছে, আর ঘুমের ট্যাবলেট জমিয়েছে। ঋজু খেয়াল ও করেনি, রাকা যন্ত্রের মত কাজ করে যাচ্ছে কিন্তু একটাও কথা বলছে না।শরীরে শরীর ও মেলাচ্ছে না। যা ঘটছে সব ই নিস্প্রান এক পুতুলের সাথে।

4

আঠারোই মে, ঋজুর অফিসে পার্টি ছিলো। ও সকালে বলেই গেছিলো ফিরতে রাত হবে।দুপুরে রাকা গুনে দেখলো, প্রায় কুড়িটা ফ্রিজিয়াম জোগাড় হয়েছে।একটা চিঠি ঋজু কে বাঁচানোর জন্য লিখতে হল, ‘No one is responsible for my death.’ আর দুটো চিঠি পোষ্ট করলো, একটা মায়ের নামে আর একটা ঋজু কে।

মা

আমি কালো হয়েছিলাম,  নিজে তো না মা! আমি তো অনেকবার তোমাদের গর্ব করার মত কাজ করেছি। কখনো গানের জন্য কখনো বা লেখায়। সেই গুলো যদি আমায় কাজেই না লাগাতে দিলে, তবে লেখা পড়া শিখিয়েছিলে কেন? আমি তো বিয়ে করতেও চাই নি। তবু কেন?কোন ঘরে বিয়ে দিয়েছিলে, তারা কেমন একটু খোঁজ  নিলে না? তাঁরা আমায় পছন্দ করে নিয়েছে? কি জন্য পছন্দ করবে? কালো, রোগা একটা মেয়ে, তারপরে খালি হাতে যে আসে, সে কি মানুষ? না মা, সে বোঝা! তোমাদের কাছেও আমি বোঝা ছিলাম। বিনা পণে মেয়ের বিয়ে দিয়েছি বলে যতই গর্ব করো, আসলে আমি বলি হয়ে গেছি। তোমাদের সমাজে নামের কাছে আমায় স্রেফ বলি দিয়েছো।মা! পারলে ভগবান কে বোলো যেন আর কোন জন্মে আমায় এই পৃথিবীতে কালো মেয়ে করে না পাঠায়। তোমরা আমায় ক্ষমা করে দিও।

রাকা।

ঋজু

তোমার ঠাকুমা ভুল বলেছিলেন। তুমি অনেক সুন্দরী মেয়ে পাবে, যার রূপ এবং টাকা তোমাদের অপ্রাপ্তির ক্ষোভ মিটিয়ে দেবে। আমি পারলাম না। মাফ করে দিও

রাকা।

রাকা ঘুমিয়ে গেছে। কিন্তু মজার ব্যাপার ও যেই কাগজে লিখতো, তাঁরা কোন ভাবে খবর পেয়ে ওর সব প্রকাশিত লেখা গুলো নিয়ে একটা বই পাবলিশ করেছে, যে টা বইমেলায় খুব বিক্রি হয়েছে।পাবলিশার্স খুশি। ভাগ্যিস মেয়েটি মারা গেছে, নইলে এতো লাভ হত কি?

5

Advertisements