আবঝা হয়ে যাওয়া একটা কখনো আয়না ছিলো ফ্রেমের সামনে বসে চুল বাঁধার চেষ্টা  করছে শুক্লা অনেকক্ষণ ধরে।তেল, সাবানহীন উড়োখুরো চুল কে ফিতেয় বাঁধার চেষ্টা। আজ প্রায় দু দিন কিছু পেটে পরেনি,পেট মুচড়িয়ে তেতো জল উঠে আসছে মুখের মধ্যে। দাঁতের ফাঁক দিয়ে চিরিক করে থুতু ফেললো উঠোনে।

এই বাড়িটা শুক্লার  ঠাকুর্দা বানিয়েছিলো।রেলের ড্রাইভার, টাকার না কি অভাব ছিলোনা। ঠাকুমাও না কি খুব সুন্দরীছিলো। ঠাকুর্দার আড়ালে নামী দামী অফিসার রাও আসতো নারকেলডাঙার রেল কলোনীতে, ঠাকুরমার কাছে। সোনায় মোরা ছিলো না কি? শুক্লা চোখ কুঁচকিয়ে হাড় সর্বস্ব ঠাকুমা কে দ্যাখে।সব ছিলো হয়ে গেছে, এখন ফক্কা। শুক্লার মনে আছে ও যখন ছোট ছিলো বাবা কোথাও চাকরি করতো, তখন এমন না খেয়ে থাকতে হত না।মাঝে মাঝে মাছ ও আসতো বাড়িতে। তারপরেই কি যে হল। মায়ের টিবি ধরা পরলো বাবার ও চাকরি চলে গেলো। সব কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেলো।

ওই! ঠাকুমা, চললে কই? চিতকার করে শুক্লা। নির্ঘাত ফেলু পিসীদের বাড়ি চা খেতে যাচ্ছে। ফেলু পিসীরা ঠাকুমা কে চা, একটু মুড়ি দেয় তাও কি এমনি? ফেলু পিসীদের পায়খানা নেই, শুক্লাদের পায়খানা ব্যাবহার করে বলেই হয়তো দেয়। ঠাকুর্দার বানানো বাড়ি আছে তাই কোনমতে  মাথা গোঁজার ঠাই আছে। আর পায়খানা টা ফেলু পিসীদের কাজে লাগে। শুক্লার হাসি ও পায়, পেটে কিছু দিলে তবে না বেড়োবে!

আজ শুক্লার তাড়া আছে। পাড়ায় চারটে বিয়ে। নিমন্ত্রন করেনি কেউ। তবু শুক্লা জানে বিয়ে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে  থাকলে  এক সময় কিছু না কিছু জুটেই যাবে ।রুপু দির বিয়ে কিন্তু যাওয়া যাবে না, তারচেয়ে মাঠের ওপারে হাজরারদের মেয়ের বিয়ে তে গেলে হয়।কলে গিয়ে ছাই দিয়েই দাঁত মেজে নেয়।শুক্লা না কি ফর্সা ছিলো তাই মা ‘শুক্লা’ নাম রেখেছিল। মা টিবি তে মরল বাবা যে কোথায় চলে গেলো কে জানে! এখন শুক্লা ঠাকুমার সাথেই থাকে। পিসি কিসের কাজ করে কে জানে রোজ রাতের ডিউটি। তা সে তার রোজগার থেকে কিছুই দেয়না। শুক্লা দেখেছে পিসী বাড়িতে থাকলে রাত দুপুরে কারা যেন ঢিল মারে, দরজা ধাক্কায়। ফিস্ফাস আওয়াজ শোনে। বোঝেনা কিছু কিন্তু ভয়লাগে। ওদের বাড়িতে চোর, ডাকাত আসবে না তবে কারা আসে?

দেখতে দেখতে সন্ধ্যে হয়। একটাই লাল জামা আছে শুক্লার, একটু কম ছেঁড়া। ফর্সা শুকনো মুখ। একটু যদি লাল রঙ পেতো তবে ঠোঁটে লাগাতো।

ঠাকমা, দোর দাও, আমি একটু ঘুরে আসছি।

কোথায় যাচ্ছিস  রে, এই সময়? বুড়ির কথায় উত্তর না দিয়ে দৌড়োয় শুক্লা। একে মাঘের ঠান্ডা, তারপরে খালি পেট। মাঠ টা  অনেক বড় লাগে ওর কাছে। তবু হাঁটে একটু খাবারের আশায়।

কি সুন্দর মাংসের গন্ধ! আহ! মুখের ভেতর জল কাটে। প্রান ভরে গন্ধ টানে শুক্লা। এদিক টা একটু ঝোপ ঝার আছে, বাড়ি ঘর বিশেষ নেই।ওই তো খাবারের পাত পরছে।আজকাল কি সুন্দর টেবিলে সাদা প্লেট করে খেতে দেয়।

এই! এখানে কে রে?মোটা গলা শুনে চমকে যায় শুক্লা। এখান থেকে তাড়িয়ে দেবে না কি?

কে রে? চুপ কেন?

আমি।

‘কে আমি?’ নাম নেই?

আমি শু- ক-লা

তা কি চাই  এখানে?

কিছু না। কাকু এখানে যদি মা নে

আবঝা আলোয় চিনতে পারে শুক্লা, মন্ডল কাকা! ওরে বাবা! একে খুব ভয় পায় শুক্লা, অবশ্য শুক্লা কেন পাড়ার অনেকেই ভয় পায়। পাঞ্চেত(পঞ্চায়েত) এর মাথা।

এদিকে আয়, দেখি। ভয়লাগলেও শুক্লা এগিয়ে জায়।খিদে কিছুক্ষনের জন্য ভয় ও তাড়িয়ে দেয়।

মন্ডল বাবু এলাকার পঞ্চায়েত প্রধান। লাল ছেঁড়া ফ্রক পরা রগা মেয়েটা কে দেখে চিনতে পারেন।

‘এই তুই কালি সিং বাবুর নাতনী না?’

ঢক করে মাথা হেলায় শুক্লা।

 

মন্ডল বাবু বুঝতে পারেন, শুকনো মুখ টা দেখে।

‘ক্ষিদে পেয়েছে? খাবি?’

শুক্লার মনে হয় মন্ডল কাকু না যেন ওর হারিয়ে যাওয়া  বাবা  জিজ্ঞাসা করছে। দু চোখে জলের ধারা নামে। মন্ডল বাবু ওর মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে নিয়েই নিমন্ত্রন বাড়িতে ঢোকেন।

শুক্লার সামনে সাদা প্লেটে ভাত, মাংসর ধোঁয়া ওঠে।গরম ভাত ঝোল দিয়ে মেখে খেতে থাকে, ভাতের সাথে মেখে যায় মানবিকতা, ভালোবাসা সব।

Advertisements