ফুলি! ফুলি!

এই খানে মা। খেলি মুন্নির সাথে।

বাড়ি আসো।

ফুলি এই বস্তিতে নিজের পাঁচ ভাই বোন আর মা বাপের সাথে থাকে। ছোট দেড় কামরার দড়মার ঘর। নর্দমার দুর্গন্ধে ভরা এক বস্তি ভারতের যে কোন প্রান্তের বস্তির মতই। সুরমাই আর তার স্বামী তাদের অনামা বংশের প্রদীপ ছেলের জন্য তিনটে মেয়ে জন্মদিয়েও হাল ছাড়েনি; তাদের এই বিশ্বাস দেখে খুশিতেই সম্ভবত ভগবান শেষ বারে জমজ ছেলে দিয়েছে। খাওয়ার মুখ বাড়লেও আয়ের রাস্তা এক, লক্সমনের কারখানার চাকরী। ছেলে দুটো দিদিদের হাতে, কোলে বড় হচ্ছে। শরীর একটু সারতেই সুরমাই চার ঘর কাজ নেয়।আলাদীনের দৈত্যের থেকেও দ্রুত সব বাড়ি বানানো হচ্ছে । সেই সব বাড়ির মহিলাদের কাজের লোক ছাড়া চোখে অন্ধকার দেখা স্বভাব ই সুরমাই এবং ওদের মত গরীব মহিলাদের রোজগারের রাস্তা।মাস গেলে হাজার ছয়েক টাকা আসে সব মিলিয়ে।

ফুলি মেয়েদের মধ্যে ছোট। ফর্সাই বলা যায়। দশ বছর বয়স। সরকারী স্কুলে পড়ে। আর সারাদিন টো টো করে খেলে বেড়ায়। লক্সমনের একটু বেশী ই আদরের।

ভালোয় মন্দয় দিন কাটছিলো। হঠাত করে কারখানায় লক-আউট হয়ে গেলো। গেট মিটিং, বিক্ষোভ করেও আর খোলানো গেলোনা।সুরমাইয়ের একার পক্ষে সবার রুটি জোগানো সম্ভব হচ্ছিলো না।বড় মেয়ে তেরো পেরিয়েছে। তাদের দেহাতে এই বয়সী মেয়ে বিন বিহাই থাকে না।এখন রিস্তা আসলেও দেন- দহেজ দিয়ে মেয়ের বিয়ে দেওয়া সম্ভব না।

সেদিন জ্বর হওয়ায় সুরমাই কাজ এ জেতে পারেনি; বড় মেয়েটা কে পাঠিয়েছে।একদিন নাগা হলে তনখা কেটে নেয় সব। বিরক্তিতে সুরমাইয়ের মুখ দিয়ে থুতু ছিটকায়।দাওয়ায় বসেছিলো। তো মুন্নির মা আর একজনমোটা মতন মহিলা এলো।

ফুলি কে লিয়ে এক রিস্তা…।বললো মুন্নির মা গোপী।

হায় দইয়া!ই কুন বাত হলো? কে কবে শুনেছে, ঘরে জওয়ান বড়ি বেটি থাকতে ছোটি কি সাদী?

গোপী আর ওই মোটা মহিলা বোঝায় সুরমাই কে।ফুলির গোরা রঙ দেখেই পছন্দ। আর তার থেকেও বড় কথা একো পিসা দহেজ নাহি। উপর সে দুলহা খুদ রোকরা দেবে। এমন কথা সুরমাই তার জীবনে শোনে নি। লড়কির সাদী হবে আর দুলহা টাকা দেবে?কে দুলহা? মোটা মহিলাটি নিজের পরিচয় দেয় রূপা দেবী নাম দিয়ে, ওনার ভাতিজা  দুলহা।উমড় একটু বেশী, হরিয়ানা তে খেত, বড়া মকান, ট্রাকটর আছে খুদ কা। রানী বনকে থাকবে ফুলি।সুরমাই অসহায় হয়ে যায় লোভনীয় প্রস্তাবে। গোপীর দিকে তাকাতে সে ও চোখের ইশারা করে রাজী হওয়ার জন্য।লক্সমনের সাথে কথা বলে তারপর বলবে, বলে দেয় সুরমাই।

দিনভর কাজের ধান্দায় ঘোরে লক্সমন, কখনো মাল টানার কাজ পায় বেশির ভাগ দিন ই কিছু পায়না।আজকাল দেশির ঠেকে যায়। কি করবে? মরদ আদমী যদি দিনে কাজ না পায়, চিন্তায় মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়,তো একটু আধটু দেশি খাবে ইয়ার দোস্তের সাথে বসে, রাতে প্রথমে বৌ কে পিটাবে পরে শরীর ধামসাবে এগুলো তো বলার মত বা লেখার মত ঘটনা না। এই জীবনচিত্র এখানে সবার ই।

সেদিন রাতে না বলে সুরমাই পরের দিন কথা পারে লক্সমনের কাছে।

ফুলি তো বচ্চি হ্যায়। লক্সমন গ্লাসে করে চা খেতে খেতে বলে।

দেহাত হলে বলতে পারতো?সুরমাই ভাবে। মুখে বলে দশ ছোড় কে গ্যারা হো জায়েগি। তারপরে বোঝায়। লক্সমন আবার পরামর্শ করে দোস্ত, ইয়ারদের সাথে।নিজের মোটা মাথায় অত ভরসা হয়না তাছাড়া গাঁও দেহাত এ সব কাজ দশ জনের সাথে আলোচনা করেই করতে হোতো, রীত বদল থোরে হি জাতে হ্যায়?

ফুলির অজান্তে তার ভবিষ্যত তৈরী হয়ে জায়।এক সন্ধ্যায় খুব বাজনা বাজিয়ে, শুয়োরের মাংস- ভাত খাইয়ে লক্সমন মেয়ের বিয়েও দিয়ে দেয়। দুলহার উমর প্রায় তার  বয়সী দেখে প্রথমে খারাপ লাগছিলো কিন্তু লাল, সবুজ মিলিয়ে দসস হাজার টাকা সব কষ্ট চাপা দিয়ে দেয়। উলটে অবাক বিস্ময়ে নিজের সৌভাগ্যে খুশি হয়ে ওঠে সুরমাই আর লক্সমন।

দিন যায়, বছর যায় ফুলির আর কোন খবর পায়না কেউ।অন্য দুই মেয়েকে বিয়ে দেয় কিন্তু কোথায় যে ফুলির বিয়ে হয়েছে, কত দূর তার শশুড়াল খোঁজ পায়না তারা।

গোপীকে জিজ্ঞাসা করে। সেও তো বুরবক বনে গ্যাছে। গোপী সেলাইয়ের কাজ নিতে যেত মহাজনের বাড়ি, সেখানেই আলাপ হয়েছিলো ও অওরতের সাথে। খুব মিষ্টি করে কথা বলেছিলো। বাড়ি তে এসে মুন্নির সাথে ফুলি কে খেলতে দেখেই বিয়ের কথা বলেছিলো।উবগার করতেই তো চেয়েছিলো গোপী।কিন্তু এখন কেমন ভয় লাগে, মেয়েটা তো মুন্নির  বয়সি ছিলো।

ফুলিকে ট্রেন এ তুলেই মিঠাই খেতে দিয়েছিলো। বাপ- মায়ের জন্য কাঁদতে কাঁদতে ঘোমটার মধ্যে দিয়েই মিষ্টি  খেয়েছিলো। চোখ খুলে দেখে একটা ঘরে চৌপাই এ শোয়া। পানির পিয়াস পেয়েছিলো।মাথা তো না পাথর এতো ভারী। তবু দরজা খুলতে গিয়ে দেখে বাইরে থেকে বন্ধ।ধাক্কা দিতে থাকে।একজন মহিলা ঘরে ঢোকে। ফুলি জল চায়।মহিলা জল দেয়।বাথরুম থেকেও ঘুরিয়ে আনে। ফুলির অবাক লাগে, সাদী ওয়ালা ঘর মনে হয়না।

রাতে রুটি, ডাল খেয়ে অন্য একটা ঘরে ঢুকিয়ে দেয়। বড় করে বিছানা পাতা মেঝেতে।ফুলি গুটি, শুটি হয়ে শোয়। মা বাপুর জন্য বুক ঠেলে কান্না আসে। কে একজন ঘরে ঢোকে। ফুলি উঠে বসে। ঘোমটার ফাঁক দিয়ে দেখে, এই লোক কি তার মরদ? চেনেও তো না। একটানে ঘোমটা খোলে লোক টা। ফুলি ভয়ে চমকে ওঠে।শুধু মুহুর্তের আর্তনাদ, ছোট্ট শরীর নেকড়ে খুবলে খায়। একবার, বার বার।পরদিন সকালে এক মহিলা চান করতে নিয়ে যায়। সারাদিন কত কাজ! ফুলি না জানে রোটি সেঁকতে না জানে ডাল ছোক দিতে।জ্বলন্ত কাঠের মার, জান্তব চিতকার করে ওঠে, বাপু! আবার রাত, এই ভাবে রাতের পরে রাত, দিনের পরে দিন। দশ হাজার উসুল হলে আবার হাত বদল হয় ফর্সা রঙের, বাপের আদরের ফুলি।

Advertisements