চার কাঠা জমির ওপর সাদা দোতলা বাড়িটা কে দেখলে গরবিনী রাজহাঁস এর কথাই মনে হয়।প্রথম দ্যাখাতেই রাকার পছন্দ হয়ে গেলেও চুপ রাখে নিজেকে। টানা গোল বারান্দা। পিছন দিকে ফলের বাগান, আর সামনে ফুলের, অবশ্য ফুল এখন নেই। এই বাড়ির মালিক আদিনাথ বাবু মারা গেছেন অনেকদিন, ওনার স্ত্রী তো একটা ছেলেকে জন্মদিয়েই মারা গেছেন।ওনার নামেই বাড়ি , ‘সুরভি ভবন।‘ তো সেই ছেলে কলকাতা থেকে আর আসতে চাইছে না, তাই বাড়ি বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন, এবং সেই বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরেই রাকা- ঋজুর আসা।
একসময় এটা গন্ড গ্রাম ছিলো কিন্তু এখন প্রোমোটারের নজর কলকাতা ছাড়িয়ে আউটস্কার্ট এর দিকে। দ্রুত বদলাচ্ছে গ্রাম শহরে , আর শহর কংক্রিটের জঙলে।সুতনু, আদিনাথ বাবুর ছেলে চাইলে এই বাড়ি প্রোমোটার কে দিতে পারতেন কেন দেন নী কে জানে? হয়তো রাকার স্বপ্নের বাড়ি হতে চায় , ‘সুরভি ভবন।‘
শেষ অবধি বাড়িটা কেনাও হয়ে গেলো। রাকা বাপের বাড়ির সম্পত্তির আধা ভাগ পেয়েছিলো, সেটা আর ঋজুর পি এফ লোন মিলিয়ে হয়ে গেলো। বেশ সস্তায় ই পেয়ে গেলো বলতে গেলে।কিছুটা মডিফাই করার দরকার ছিলো বিশেষ করে বাথরুম আর কিচেন।গৃহপ্রবেশ আত্মীয় দের নিয়ে সেরে ফেললো। কিন্তু বন্ধুরা ছাড়বে কেন? ওদের অনারেই এক শুক্রবার ডিনার এ ডাকলো বন্ধুদের। দুজনের মিলে বন্ধু সংখ্যা ভালোই।নয় নয় করে তিরিশ জন হয়েই গেলো। পানীয় ছাড়া তো আজকাল কোন পার্টি জমেনা।বাগানটা বাড়িতে আসার পরেই পরিস্কার করিয়েছিলো; ওখানেই মিনি বার বানিয়ে দিলো কেটারিং এর লোকেরা।গান-পান খাবারে পার্টি শেষ হতে হতে অনেক রাত হল। ওরা চলে যেতে কেটারিং এর ছেলে গুলকে জোর করে রাকাই খাওয়ালো। প্রায় শেষ রাতে শুতে গেলো। শরীর ক্লান্ত হলেও মনের খুশিতে রাকার আর ঘুম আসছিলোনা; নানান কথা ভাবতে ভাবতে চোখ লেগে গেছিলো একটা কেমন অস্বস্তি, যেন কেউ মুখের কাছে ঝুঁকে ওকে দেখছে, চোখ ভালো করে খুলতে না খুলতেই কে যেন সরে গেলো! অদ্ভুত তো! ঋজু পাশ ফিরে ঘুমোচ্ছে, কিন্তু রাকার স্থির বিশ্বাস ঘরে একটু আগেও কেউ ছিল; হালকা বকুল ফুলের গন্ধ এখন রয়ে গেছে ঘরের মধ্যে।
শনিবার ঋজু একটু আলসেমি করে।রাতে ভালো ঘুম হয়নি তবু রাকাই চা নিয়ে এসে ডাকলো ঋজু কে।
গুড মর্নিং! বলেই ঋজু বিছানায় আধ শোয়া হয়ে চায়ের কাপের দিকে হাত বাড়ায়।দু এক চুমুক দেওয়ার পরে খেয়াল করে রাকা চায়ের কাপ হাতে বসেই আছে, খুব অন্যমনস্ক।
কি ব্যাপার ম্যাডাম, কি ভাবছো?
কিছু না, বলে হাসে রাকা।
নানান কাজে, অকাজে ছ’মাস হয়ে গেলো নতুন বাড়িতে। এর মধ্যে বাড়ির সামনের দিকের জায়গায় সুন্দর একটা ফুলের বাগান করেছে রাকা।বাড়ির পিছন দিকে আম, কাঁঠাল এবং অন্য নানা ফলের গাছ থাকলেও এই বাড়ি বা এলাকায় কোন বকুল গাছ দেখেনি রাকা।
সেদিন রাতেই আবার রাকার ঘুম ভেঙে যায়। কে যেন ঠিক মুখের কাছে এসে ওকে দেখছে; রাকা চিৎকার করতে চায় কিন্তু গলা থেকে আওয়াজ বেড়োয় না।একটা কিছু করা দরকার। এখানকার প্রতিবেশিরাও খুব ভদ্র। সেদিন বিকেলের দিকে রাকা সামনের বাড়ির ব্যানার্জী কাকুদের বাড়ি যায়। ব্যানার্জীরা বহু বছর এই এলাকার বাসিন্দা। ওনাদের ছেলে পুলে নেই। রাকা গিয়ে দেখে কাকিমা চা বানাচ্ছেন। আমিও খাবো কিন্তু রাকা জানায়।
না, দেবনা। চা খেলে কাল হয়ে যাবে। কাকীমা কাপের ট্রে হাতে হাসতে হাসতে এসে বলে। একথা সে কথার পরে রাকা জিজ্ঞাসা করে, ‘ কাকীমা, আমাদের বাড়িটা এতো বছর বিক্রি করেন নী কেন?’
ব্যানার্জী গিন্নি থমকিয়ে যান। তারপরে বলেন,’হয়তো বাড়ি বিক্রি করতে চান নি আদিনাথ দা।ওনার স্ত্রী অনেক শখ করে বানিয়েছিলেন।ভোগ করতে পারেনি বেচারি।‘
কি হয়েছিলো?
বাচ্চা হতে গিয়ে কোন কমপ্লিকেশনেই মানে।। আসলে আমিও ঠিক জানিনা। নতুন বৌ ছিলাম।
সুরভি নাম ছিলো তাই না?
হু।
কাকীমার অস্বস্তি বুঝে রাকা চুপ করে যায়।
রাকা বই পড়তে খুব ভালোবাসে। গল্প, উপন্যাস থেকে নিয়ে ইতিহাস, ফিলোজফি মানে বই হলেই হল।স্টাডিটা সাজিয়েওছে সুন্দর করে।দেওয়াল জুড়ে কাচে ঢাকা বুক্সেলফ। রিডিং টেবিলে সুন্দর ঝালর দেওয়া ল্যাম্প। এক পাশে মিনি বার।ঋজু আসতে আসতে অনেক রাত। আট টা নাগাদ এক পেগ হুইস্কি নিয়ে নিজের টেবিলে এসে বসে রাকা। একটা বই পেয়েছে এনথ্রোপোলজির ওপরে। পড়তে পড়তে গ্লাসে হাল্কা চুমুক দিচ্ছিল। তারপরে কখন যে বিষয় টার মধ্যে ডুবে গেছে, ড্রিংক অর্ধেক ও শেষ করেনি। পড়েই যাচ্ছে ।ট্রাইবাল লাইফ, ওদের বিশ্বাস, জীবন যাপন কলিং বেল এর আওয়াজে চমকে ওঠে। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে ঋজু বলে সুন্দর একটা গন্ধ! তোমার বাগানের ফুলের না কি?
না, এটা বকুল ফুলের গন্ধ! আর তার থেকেও বড় কথা এই এলাকায় কোন বকুল গাছ নেই, দ্বিতীয় এখন বকুল ফুলের সময় ও না।
ও! তাহলে তোমার পারফিউমের গন্ধ। বলে বাথরুমে চলে যায় ।
রাকার গা ছমছম করতে থাকে। ঘরে যেন আরো কেউ আছে, যা কে দেখা যায়না শুধু অনুভব করা যায়। সেই রাতে রাকা অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখে। একজন সুন্দরী মহিলাওকে হাতের ইশারায় ডাকছেন।ও তার কাছে গেলে তিনি বলেন, আমার বাড়ি কিন্তু আমি থাকতেও পারিনি।মহিলার চোখ দিয়ে জল পরছে। কি কষ্ট! কি কষ্ট! ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসে।
আজ ব্যানার্জী কাকিমা কে চেপে ধরে রাকা। বলে তার স্বপ্নে দেখা মহিলার চেহারার কথা। কিন্তু বলেনা স্বপ্নে দেখেছে। ওর মুখে বর্ননা শুনে ব্যানার্জী কাকীমার ও মুখ গম্ভীর হয়ে যায়।
উনি যা বলেন তা ওনার জবানীতেই শোনা ভালো।
তখন আমিও নতুন বৌ।সুরভির সাথে খুব ভাব হয়ে গেছিলো। তখনকার দিনে বিয়ের পরে বাপের বাড়িতে বৌ কে খুব ই কম যেতে দেওয়া হত। মন খারাপ লাগলেও শ্শুর,শাশুড়ির মুখের ওপর কিছু বলতে পারতামনা। তাই সুরভি কে পেয়ে বা আমাকে পেয়ে সুরভির দুজনে ই নিজেদের সুখ- দুঃখে র কথা ভাগ করার বন্ধু পেয়েছিলাম।সুরভি কে আদিনাথ দা যতই ভালোবাসুন না কেন ওনার মা আর বোনের জন্য খুব একটা প্রকাশ করতে পারতেন না।উনি খালি মানিয়ে নিতে বলতেন।সুরভি যখন কনসিভ করলো তখন অত্যাচারের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ওনার শাশুড়ি আর ননদ। বাড়ির নাম ‘সুরভি’ রাখায় আগুনে ঘি পরেছিলো। সারাদিন নানান অশান্তিতে ওর ব্লাড প্রেসার বেশি হয়ে গেছিলো। আর কাজ করলেও ভালো করে খেতে দিতেন না ওরা।একদিন সুরভি এক কাপ দুধ খেয়েছিলো বলে ওর ননদ ওকে দিয়ে পুরো বাড়ি ঘর মুছিয়েছিলো। এডভান্স স্টেজ তখন সুরভির। দুপুর থেকেই কোমরে- পেটে যন্ত্রণা। শেষে বেশ বাড়াবাড়ি হতেই আমাদের বাড়িতে ওদের কাজের বৌ খবর দেয় আমি আর আমার শাশুড়ি গিয়ে দেখি সুরভি শুয়ে আছে,ব্যথায় নীল ঠোঁট। আমার শাশুড়ি ওনার শাশুড়ি কে বলেন আদিনাথ দা কে খবর দিতে এবং ওকে হাসপাতালে নিতে। কিন্তু ওরা পাত্তাই দিলোনা। উলটে ওর শাশুড়ি ঝাঁঝিয়ে বললো, ‘হ্যাঁ একা ওনার ই পেট বেঁধেছে , আমিও ছেলে পুলে জন্ম দিয়েছি। মরবে না।‘ এই শুনে আমার শাশুড়ির ও খারাপ লেগেছিলো।সেদিন অনেক রাতে আদিনাথ ফিরে হাসপাতালে নিয়ে গেছিলেন। তখন এই অঞ্চলে গাড়ি, ঘোরাও চলতোনা। ছেলের মুখ আর দেখতে পারেনি সুরভি। মারা গিয়েছিলো। আদিনাথ দা কে আবার বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন ওনার মা। কিন্তু উনি বিয়ে করেন নি। সুরভির শাশুড়ি হঠাত একদিন পাগল হয়ে গেলেন। কার কাছে যেন হাত জোর করে ক্ষমা চাইতেন। আর ননদ কে বিয়ের পরে তার শ্বশুর বাড়ির লোকে পুড়িয়ে মারে।
রাকা চুপ করে শুনছিলো। কাকীমার ও চোখে জল।রাকা বাড়ি ফিরে ঠিক করে আর ওনাকে ভয় পাবেনা। সুরভি কাকীমা আপনার বাড়ি আপনিও থাকুন। আমরা আপনার দুঃখে দুঃখিত। মনে মনে এই কথা বলতেই বকুল ফুলের গন্ধ কিছুক্ষন থাকলো তারপরে মিলিয়ে গেলো। আর কোনদিন ও ওই গন্ধ বা ওনার উপস্থিতি টের পায়নি রাকা।

Advertisements